রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন উত্তেজিত জনতা। একই দাবিতে জাতীয় শহীদ মিনারে, মিরপুরের কালসি, কাওরান বাজার, গুলশানসহ সারা দেশে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (২২ মে) নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠে উঠে আসে একটাই দাবি- “বিচার চাই”।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধ
জুমার নামাজের পর বিক্ষোভকারীরা রাজধানীর ব্যস্ততম মোড় মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধ করলে ওই এলাকায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার এবং নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান। পরে অবরোধ তোলার জন্য ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নামানো হয়। এ সময় গোলচত্বর এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়ন করে জোরদার করা হয় সেখানকার নিরাপত্তাও। অবরোধকারীদের সড়ক ছাড়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে বারবার অনুরোধ করা হলে সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের দিকে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা।
কাওরান বাজারে মানববন্ধন
শিশু ও নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও সহিংসতার প্রতিবাদে রাজধানীর কাওরান বাজারে মানববন্ধন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। আজ শুক্রবার বিকাল ৪টায় কাওরান বাজারের সার্ক ফোয়ারা মোড়ে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়ে শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। ‘বিচার চাই’ স্লোগানে সরব হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
গুলশান-২ এলাকায় দ্রুত বিচার ও নিরাপত্তার দাবি
রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায়ও রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার ও নারী-শিশুর নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশ নেন গুলশান সোসাইটির সদস্যরা। বক্তারা বলেন, “গত ১৯ মে যে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, তা পুরো মানবজাতির জন্য কলঙ্ক। রামিসার মতো একটি প্রাণবন্ত শিশুর এমন নির্মম মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অনিরাপদ বাংলাদেশ চাই না।” মানববন্ধনে তারা আরও বলেন, “একটা নাবালক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। এই জঘন্য অপরাধে সরকার এবং বিচার বিভাগের কাছে ‘আমরা গুলশান সোসাইটি’র পক্ষ থেকে দ্রুত সুষ্ঠ বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কামনা করছি। আমরা দীর্ঘ বিচারের অপেক্ষায় থাকতে রাজি না।”
শহীদ মিনারে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন
রামিসা হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আজ বিকালে জাতীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বপ্নের বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এই প্রতিবাদ সভায় বক্তারা আসামিদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
রাজবাড়ীতে প্রতিবাদ সমাবেশ
রামিসার হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাসস্ট্যান্ডেও এ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। শুক্রবার সকাল ১০টায় ‘শিশুর ও নারীর নিরাপত্তা চাই, ধর্ষক-নিপীড়কের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ স্লোগানে অনুষ্ঠিত এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, “এভাবে আর কত রামিসা শেষ হবে! আমরা আর কোনও রামিসার এমন পৈশাচিক, নৃশংস মৃত্যু দেখতে চাই না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হবে।”
পাবনাতে মানববন্ধন
শিশু রামিসা হত্যার প্রতিবাদ ও হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবিতে পাবনার ঈশ্বরদীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। স্থানীয় সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আলোর পদযাত্রী’সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ঈশ্বরদীর খাইরুজ্জামান বাসস্ট্যান্ডে এই প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানববন্ধন
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ শিশুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বিকালে প্রথম আলো বন্ধু সভার আয়োজনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও সংগঠকসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
খুলনায় ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ
শিশু রামিসা হত্যার বিচার, চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসের অবসান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে খুলনা মহানগর ইসলামী ছাত্রশিবির। আজ বাদ জুমা খুলনা মহানগরীর নিউমার্কেট বায়তুন নূর মসজিদ চত্বর থেকে শুরু হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ময়লাপোতা মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। মানববন্ধনে বক্তারা শিশু রামিসাসহ শিশু হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণসহ সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। একইসঙ্গে অবিলম্বে আত্মস্বীকৃত ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
এছাড়া রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার ও আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে সকালে মিরপুরের পল্লবীতে একটি ফ্ল্যাট বাসার খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। পুলিশ প্রথমে প্রধান আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে। পরবর্তীতে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সোহেল।



