জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও পরিবারকে বিশাল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা তারা বিদেশে পাচার করেছে এবং ঋণখেলাপি হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়েও একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে
আজ বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) এক আলোচনা অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'বর্তমান সরকারের যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে এই সরকারের এস আলম কে হবে, এই সরকারের সালমান এফ রহমান কে হবে—এটার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই এটা স্পষ্ট হবে যে নতুন এস আলম, নতুন সালমান এফ রহমান কে হতে যাচ্ছে।'
অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক ঐক্য
নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সরকার মোকাবিলা করতে পারত যদি তারা জাতীয় ঐক্য বজায় রাখত এবং জনগণ ও বিরোধী দলের আস্থা ধরে রাখতে পারত। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক সংস্কার রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে অত্যন্ত সম্পর্কিত। সরকার সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই সনদে থাকা রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি, ফলে অর্থনৈতিক সংস্কারের যাত্রা শুরু করা সম্ভব হয়নি।
ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচার রোধে সংস্কার জরুরি
আওয়ামী লীগ আমলের মতো ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্য সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন নাহিদ। তিনি বলেন, 'এমন কিছু সংস্কার প্রয়োজন, যাতে ঋণখেলাপি ও বিদেশে টাকা পাচার রোধ করা যায় এবং পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনা যায়। পাচার হওয়া টাকা যথাসম্ভব দেশে ফেরত আনার চেষ্টা করতে হবে।'
ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জনের তাগিদ
বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে প্রথমে দেশীয় ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে হবে বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, 'দেশীয় ব্যবসায়ীদের যদি বিনিয়োগ করার বা বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আস্থা না থাকে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসবে না।' সরকার ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জনের জন্য নিজের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করে তা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে জড়িত ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন পদে রাখছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ বঞ্চনা
নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আপনারা বড় বড় গোষ্ঠীকে, করপোরেটকে ঋণ দেবেন, যা তারা রাজনৈতিক লবিংয়ের মাধ্যমে পায় এবং শোধ করবে না। কিন্তু একজন কৃষককে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ দিলে তা পরিশোধ না করলে তাকে জেলখানায় নেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের পেছনে ঘুরে ঋণ পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না।'
বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি
দেশীয় ও বিদেশি ব্যবসায়ীদের আস্থা তৈরির জন্য রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গত ১৬ বছরের দুর্নীতি ও লুটপাটের অর্থনীতি থেকে পরিবর্তনের প্রত্যাশা সরকারের বাজেটে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশি-বিদেশি কেউই সরকারের ওপর আস্থা রাখবে না।
সরকারকে উন্মুক্ত হওয়ার আহ্বান
সরকারকে উন্মুক্ত হয়ে সঠিক তথ্য সরবরাহের আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আসলেই যতটুকু সংকট, সেটা বলতে হবে অন্যের ওপর দায় না চাপিয়ে। দেশ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কোনো সরকার এককভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না। সব দল, পক্ষ ও জনগণের সহযোগিতা লাগবে, সৎ ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে হবে।'
আজ বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে এনসিপির এই আয়োজন শুরু হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। এরপর পাঁচ পর্বের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনা হয়।



