গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ: রাষ্ট্র ও সভ্যতার বহুমাত্রিক আলোচনা
গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ: রাষ্ট্র ও সভ্যতার আলোচনা

মানুষ সভ্যতার শুরু থেকেই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছে। নিজের মত প্রকাশ, সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষা এবং নিরাপদ রাজনৈতিক কাঠামোতে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নিয়েছে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই দুটি ধারণা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। গণতন্ত্র মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচারের কথা বলে; অন্যদিকে জাতীয়তাবাদ একটি জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্র বা জাতিসত্তার ভিত্তি নির্মাণ করে।

গণতন্ত্রের ধারণা ও বিকাশ

'Democracy' শব্দটি গ্রিক 'Demos' (জনগণ) ও 'Kratos' (ক্ষমতা) থেকে এসেছে। প্রাচীন এথেন্সে নাগরিকরা সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতেন, যদিও নারী, দাস ও বিদেশিরা এর বাইরে ছিল। আধুনিক যুগে ফরাসি বিপ্লব 'স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব' আদর্শের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করে। গণতন্ত্রের প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে জনগণের সার্বভৌমত্ব, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নির্বাচন ব্যবস্থা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।

গণতন্ত্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। একজন মানুষ কী বলবে, কী লিখবে, কোন ধর্ম পালন করবে বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করবে এসব বিষয়ে রাষ্ট্র অযথা হস্তক্ষেপ করবে না। অর্থনৈতিক মুক্তিও গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কেবল রাজনৈতিক অধিকার থাকলেই গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। জন লক মনে করতেন, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষার জন্যই রাষ্ট্র গঠিত। জ্যাঁ জ্যাক রুশো তার 'সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' তত্ত্বে বলেন, জনগণের সাধারণ ইচ্ছাই রাষ্ট্রের ভিত্তি। জন স্টুয়ার্ট মিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের প্রাণ বলে মনে করতেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাতীয়তাবাদের ধারণা

জাতীয়তাবাদ একটি মানসিক ও রাজনৈতিক চেতনা যা মানুষকে জাতিগত, সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে। এর মূল উপাদান হলো অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূখণ্ড, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও সম্মিলিত চেতনা। আধুনিক জাতীয়তাবাদের উত্থান ইউরোপে, বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লবের পরে। জিউসেপ্পে মাজিনি ইতালির জাতীয় ঐক্যের তাত্ত্বিক ছিলেন; অটো ভন বিসমার্ক জার্মান জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার 'Nationalism' গ্রন্থে পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক ও আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেন। তিনি মনে করতেন, জাতীয়তাবাদ যদি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা, সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তা মানবতার জন্য বিপজ্জনক। ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদ হওয়া উচিত মানবিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। মহাত্মা গান্ধী জাতীয়তাবাদকে অহিংস সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন; কাজী নজরুল ইসলাম সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানবিক জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন।

গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক

গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এরা কখনো একে অপরকে শক্তিশালী করে, আবার কখনো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র জনগণের মতামত, অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে; জাতীয়তাবাদ জনগণকে অভিন্ন পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করে। রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা মনে করেন, স্থিতিশীল রাষ্ট্রের জন্য এদের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিকে 'Imagined Community' বা কল্পিত সম্প্রদায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জুর্গেন হাবেরমাস 'Constitutional Patriotism' তত্ত্বে বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সংবিধান ও নাগরিক অধিকার। সিভিক জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর দাঁড়ায়, যেখানে নাগরিকত্ব ও আইন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে এথনিক জাতীয়তাবাদ বর্ণ, ধর্ম বা রক্তের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হতে পারে।

উগ্র জাতীয়তাবাদের ভয়াবহ উদাহরণ হলো হিটলারের নাৎসিবাদ, যা গণতন্ত্র ধ্বংস করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও গণহত্যা ডেকে আনে। অন্যদিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি হিসেবে কাজ করে। আর্নেস্ট গেলনার মনে করেন, আধুনিক জাতীয়তাবাদ শিল্পায়ন ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। জন স্টুয়ার্ট মিল বলেন, গণতন্ত্র তখনই সফল হয় যখন জনগণের মধ্যে সাধারণ জাতীয় অনুভূতি থাকে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদ সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয়তাবাদ জনগণের ঐক্যের প্রধান শক্তি ছিল। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা জনগণকে অভিন্ন পরিচয়ে একত্রিত করেছিল। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সঠিক ভারসাম্যের মাধ্যমে তারা পরস্পরের শক্তি হতে পারে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ' ধারণা গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা ছিল। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। তার জাতীয়তাবাদ ছিল সিভিক জাতীয়তাবাদের কাছাকাছি, যেখানে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও নাগরিক ঐক্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি জাতীয়তাবাদকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন ও যুবশক্তির বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেন।

বিশ্বায়ন ও নতুন জাতীয়তাবাদ

বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়নের কারণে জাতীয়তাবাদ নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, অভিবাসন সংকট ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের মানবিক জাতীয়তাবাদের ধারণা নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বমানবতার কথা বলেছিলেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রের দুটি মৌলিক ভিত্তি। গণতন্ত্র মানুষকে স্বাধীনতা ও অধিকার দেয়; জাতীয়তাবাদ মানুষকে ঐক্য ও আত্মপরিচয় দেয়। এদের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয়তাবাদ যদি মানবিকতা হারায়, তা উগ্রতায় পরিণত হয়; গণতন্ত্র যদি জাতীয় ঐক্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই একটি আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন মানবিক গণতন্ত্র ও সহনশীল জাতীয়তাবাদ।

অতএব, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক সহনশীলতা ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।