তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের আশঙ্কা, দলে বিদ্রোহের সুর
তৃণমূলে ভাঙনের আশঙ্কা, দলে বিদ্রোহের সুর

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির এক মাসও পেরোয়নি। এরই মধ্যে প্রায় দেড় দশক ধরে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বহিষ্কার ও বিদ্রোহ

ভোটের পর বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রস্তাবনাপত্রে বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ এনে দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরপর দলের একটি অংশ 'বিদ্রোহী' হয়ে উঠেছে বলে জানা যাচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিদ্রোহের একটি নমুনা হলো গত রোববার মমতা ব্যানার্জীর ডাকা বৈঠকে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ২০ জন উপস্থিত ছিলেন।

একদিকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, তৃণমূল 'কার্যত উঠে যাওয়া একটি পার্টি'। অন্যদিকে, মমতা ব্যানার্জী সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন, তৃণমূলকে ভাঙা কখনোই সম্ভব নয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাক্ষর বিতর্ক

সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগটি বিধানসভার স্পিকারের কাছে জানিয়েছিলেন তৃণমূলেরই দুই বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা। এরপরই তাদের বহিষ্কার করা হয়। দলটির অনেক নেতা, মুখপাত্র ও বিধায়ক ভোটে হারের পর থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহার পরিকল্পনায় দলের ফাটল আরও চওড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি তারা নির্বাচিত বিধায়কদের সিংহভাগের সমর্থন পান, তাহলে তাদের মধ্য থেকে কেউ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ দাবি করতে পারেন। বিজেপির তাপস রায় সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার হয়েছে এবং প্রায় ৫০ জন বিধায়ক ঋতব্রতের নেতৃত্বে স্পিকারের কাছে পৌঁছেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বহিষ্কৃতদের বক্তব্য

ঋতব্রত ব্যানার্জী বলেন, 'আমাকে তৃণমূল বহিষ্কার করতে পারে, কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা এতটুকুও কমে না। তিনি আমাদের সকলের নেত্রী।' তবে তাপস রায়ের মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি আর সন্দীপন যৌথভাবে স্পিকারকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কোনো জল্পনাকে ইন্ধন দেওয়ার মতো উপাদান আমার কাছে নেই।'

সন্দীপন সাহা বার্তাসংস্থা এএনআইকে বলেন, 'দলে নৈতিক কথাবার্তা বললেই দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ আনা হয়, কারণ দল নিজেই নৈতিক আচরণ করে না।' তবে দলের পদক্ষেপ নিয়ে তার 'আক্ষেপ নেই'।

তৃণমূলের পাল্টা প্রশ্ন

তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, ঋতব্রত ও সন্দীপনার উচিত ছিল স্পিকারের বদলে তৃণমূলকে বিষয়টি জানানো। মমতা ব্যানার্জী ফেসবুক লাইভে ঋতব্রতের নাম না করেই বলেন, 'সিপিএম করত। আমাদের ভুল হয়েছে তাকে টিকিট দেওয়া।' কুণাল ঘোষ বলেন, 'জিতে গেলে, সরকার গড়লে সব ভাল। আর আজ দল ক্ষমতায় নেই বলে সব খারাপ? তাহলে দলের টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন কেন?'

ভাঙনের সম্ভাবনা

ঋতব্রত ও সন্দীপনাকে বহিষ্কারের পর তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০ থেকে কমে ৭৮ হয়েছে। যদি দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি বিধায়ক দলত্যাগ করতে রাজি হন, তাহলে তারা বিরোধী দলনেতার পদ দাবি করতে পারেন। ইতোমধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে যে তৃণমূলের বিধায়কদের একটি বড় অংশ বেরিয়ে যেতে পারেন, যদিও তৃণমূল সেই জল্পনা খারিজ করেছে।

কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বলেন, 'দলের ভাঙনে পুশ ও পুল দুটি ফ্যাক্টর কাজ করে। মমতা ঋতব্রত ও সন্দীপনকে ছাড়া কাউকে বহিষ্কার করেননি। আর পুল ফ্যাক্টর হিসেবে বিজেপি জানিয়েছে অন্য দল ছেড়ে আসা কাউকে নেবে না। কংগ্রেসও আগ্রহ দেখায়নি।'

বিবিসি বাংলার সিনিয়র সাংবাদিক শুভজ্যোতি বলেন, 'দলের কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। এটি সম্পূর্ণ মমতা ব্যানার্জীকেন্দ্রিক। মমতা নিজে যখন কোণঠাসা, দলও দিশেহারা।' তিনি আরও বলেন, 'মমতার শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুরে শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের ভাঙন দৃশ্যমান। অথচ আজও তৃণমূলের লোকসভা ও রাজ্যসভায় ৪২ জন সাংসদ, বিধানসভায় ৮০ জন বিধায়ক এবং ৪১ শতাংশ ভোট রয়েছে।'