বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য সরকার থেকে পাওয়া অনুদানের তথ্য গোপন করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মুখপাত্র সিনথিয়া জাহিন আয়েশা। তিনি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি রিফাত রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম এবং মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তোলেন।
অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে সিনথিয়া জাহিন আয়েশা বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দলের নয়; এটি সাধারণ জনগণের সংগঠন। এই সংগঠনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের অর্থ নিজেদের মতো ব্যবহারের কোনও সুযোগ নেই। তার দাবি, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রায় ১ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তাদের অন্ধকারে রেখে সেই অর্থ লোপাট করা হয়েছে।
তিনি জানান, ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে দেশব্যাপী অনলাইনে প্রচারণার আয়োজন করা হয়েছিল। তখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এত বিপুল অর্থের জোগান কীভাবে আসবে। জবাবে বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগত অর্থে এমনকি ‘বাবার টাকায়’ এই প্রচারণা চালানো হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও তাকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ
এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যবহারের ওপর অডিট এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, গত বছরের ২৫ জুন প্রথম জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে সরাসরি ভোটে কেন্দ্রীয় মুখপাত্র নির্বাচিত হন সিনথিয়া জাহিন আয়েশা। এছাড়াও কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য সচিবসহ অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতারা ছিলেন।
কিন্তু বাস্তবে তাদের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি এবং ধারাবাহিকভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রশাসনিক অ্যাকসেস থেকেও তাদের বঞ্চিত রাখা হয়। তার অভিযোগ, সব ধরনের সিদ্ধান্ত সভাপতি রিফাত রশিদ এককভাবে নিয়েছেন, যা সংগঠনের গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি। এটি কেবল ব্যক্তিগত অবমূল্যায়ন নয়, বরং সংগঠনের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ।
অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
তিনি আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে দেশব্যাপী প্রচারণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বিষয়ে অনলাইন মিটিংয়ে অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ব্যক্তিগত খরচে কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও তা কেন্দ্রীয় মুখপাত্র, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বা অন্যান্য দায়িত্বশীলদের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং গোপন রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, তারা বারবার জবাবদিহি চাইলেও বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে এবং এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। উল্টো তাদের বিরুদ্ধে সংগঠনকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। সর্বশেষ ১২ এপ্রিল এক কেন্দ্রীয় বৈঠকে একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কমপক্ষে ১ কোটি টাকা সংগ্রহের বিষয়টি স্বীকার করা হয়।
তবে ওই অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে তার কোনও স্বচ্ছ তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমনকি ওই বৈঠকে ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপনের আগেই উপস্থিত সদস্যদের মোবাইল ফোন জব্দ করে নেওয়া হয়, যাতে কোনও তথ্য সংরক্ষণ করা না যায়।
তিনি বলেন, উপস্থাপিত হিসাব গোপন রাখায় তা অবিশ্বাস্য, অসংগঠিত ও গোজামিলপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিত আর্থিক অনিয়ম ও সম্ভাব্য আত্মসাতের ইঙ্গিত বহন করে।
অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ
এছাড়া অভিযোগ করা হয়, জবাবদিহি চাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নেতারা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে একটি রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নেন এবং কোনও সাংগঠনিক আলোচনা ছাড়াই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে অবৈধভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, সংগঠনের কেন্দ্রীয় ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে একটি প্রেস রিলিজ প্রকাশ করা হয়, যেখানে একটি তথাকথিত উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। ওই পরিষদের অধিকাংশ সদস্য একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তথ্য চেয়ে চিঠি
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফান্ডের উৎস ও ব্যয়ের সঠিক তথ্য জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে তথ্য পাওয়ার পর তা গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম, দফতর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন এবং লিগ্যাল সেল সম্পাদক মাহফুজ এ আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত।



