সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলায় আরও ১০ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ সম্পন্ন
চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় আরও ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার বিচারক মিজানুর রহমানের আদালতে এ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়, যা মামলাটির অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলার বর্তমান অবস্থা ও সাক্ষ্যগ্রহণের বিবরণ
দুদকের পিপি মোকাররম হোসাইনের বক্তব্য অনুযায়ী, সাবেক মন্ত্রী জাবেদসহ মোট ৩৬ জনের বিরুদ্ধে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার আদালতে দুদক পক্ষ থেকে ১০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এ নিয়ে মামলাটিতে এখন পর্যন্ত ১১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হলো। আদালত আগামী ৫ মে মামলার পরবর্তী সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য করেছেন, যা বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভিযোগপত্রে উল্লিখিত আত্মসাতের কৌশল ও সময়সীমা
দুদকের অভিযোগপত্রে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে এই আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছিল। আরামিট গ্রুপের প্রটোকল অফিসার ফরমান উল্লাহ চৌধুরীকে ব্যবসায়ী সাজিয়ে ‘ভিশন ট্রেডিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স করা হয়। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর ইউসিবিএল ব্যাংকের চট্টগ্রাম পোর্ট শাখায় এই প্রতিষ্ঠানের একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। পরের বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি গম, হলুদ, ছোলা ও মটর আমদানির অজুহাতে ১৮০ দিনের জন্য টাইম লোনের আবেদন করে।
ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম: ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ নেতিবাচক প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করে, যা একটি গুরুতর নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঋণের টাকাগুলো আলফা ট্রেডার্স, ক্লাসিক ট্রেডার্স, মডেল ট্রেডিং ও ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং নামে চারটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে পে-অর্ডারের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়। এরপর এই অর্থ নগদে উত্তোলন ও স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে এসব টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে সম্পত্তি ক্রয় এবং জাবেদের মালিকানাধীন আরামিট সিমেন্ট ও আরামিট থাই অ্যালমুনিয়াম লিমিটেডের হিসাবে জমা করে দায় সমন্বয় করা হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই আত্মসাতের ঘটনা ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল।
মামলার ইতিহাস ও আসামিদের তালিকা
এর আগে ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারী দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমান। ৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. হাসানুল ইসলাম অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন, যা মামলাটির আনুষ্ঠানিক শুরুর নির্দেশনা দেয়।
মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ছাড়াও তার পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন:
- জাবেদের স্ত্রী রুকমিলা জামান
- ছোট ভাই আসিফুজ্জামান
- বোন রোকসানা জামান
- ইউসিবিএল ও আরামিট গ্রুপের বিভিন্ন কর্মকর্তা
মোট ৩৬ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে, যা দুর্নীতির জটিল নেটওয়ার্কের ব্যাপকতা তুলে ধরে। চট্টগ্রাম আদালতে চলমান এই মামলাটি দেশের দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছে।



