গণভোটের রায় অস্বীকারে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের অভিযোগ শফিকুর রাহমানের
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রাহমান অভিযোগ করেছেন যে, গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে ফ্যাসিবাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। তিনি সোমবার দুপুরে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন।
ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি
শফিকুর রাহমান বলেন, 'যেদিন গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করা হয়েছে, সেদিন থেকেই নতুন করে আবার ফ্যাসিবাদের যাত্রা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। আমরা এই যাত্রা, কদম কদম যাত্রা থামিয়ে দেব ইনশা আল্লাহ। আমরা এগোতে দেব না।' তিনি উল্লেখ করেন যে, ৫৪ বছরে দফায় দফায় ফ্যাসিবাদ জাতিকে এগিয়ে যেতে দেয়নি, কিন্তু চব্বিশের বিপ্লবীরা তা বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করেছিল।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'এখন কারা নর্দমা থেকে এটাকে তুলে আনতে চায়। মনে রাখা দরকার, এই প্রজন্ম প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা জেগে উঠলে মাসের পর মাস, বছরের বছর আন্দোলন করার প্রয়োজন হয় না। তাদের বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তই ফ্যাসিবাদিদের কলিজায় কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।'
জনগণের রায় হাইজ্যাকের অভিযোগ
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, 'আমাদের রায়কে হাইজ্যাক করা হয়েছে, ডাকাতি করা হয়েছে, জনগণকে অপমান করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই তার রাজসাক্ষীও পাওয়া গেছে।' তিনি রূপক ভাষায় যোগ করেন, 'ঘুঘু তুমি একবার জনগণের ধান খেয়েছ, আবার খাওয়ার চিন্তা কোরো না। এবার এলে ঠিকই তোমার লেজ, ঠিকই তোমার পা, ঠিকই তোমার ডানা অবশ করে দেওয়া হবে।'
শফিকুর রাহমান দাবি করেন, '৭০ ভাগ জনগণ “হ্যাঁ”-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে—এটাই তার প্রমাণ। আমরা “হ্যাঁ”-এর পক্ষে ছিলাম। আমরা “হ্যাঁ”-এর পক্ষে আছি। আমরা দেখিয়ে যাব, এই সংসদ মানুক আর না মানুক, গণভোটের রায় আমরা বাস্তবায়ন করব।'
সংসদ থেকে জনগণের কাছে ফেরার সিদ্ধান্ত
জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল সংসদ থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি। গত শনিবার জনগণকে নিয়ে আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা একটি শুরু মাত্র।
জামায়াত আমির সংসদে সরকারি দলের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, 'সংসদে সরকারি দল কথা বললে মনে হয় দেশে সোনার নহর বয়ে যাচ্ছে। তবে বিরোধী দল জ্বালানিসংকট নিয়ে কথা বলতে চাইলে নোটিশ আলোচনায় আসতে দেওয়া হয় না। তারা ভয় পায়, এর মাধ্যমে জনগণের কাছে সত্য প্রকাশ পেয়ে যাবে।'
জ্বালানি ও কৃষি সংকটের সমালোচনা
তিনি কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে বর্তমান মৌসুমে খামারিদের সেচের পানির অভাব এবং খোলা তেল না দেওয়ার সমালোচনা করেন। শফিকুর রাহমান বলেন, 'কার্ড নিয়ে আসতে বলে। তাঁরা কার্ড আনবেন কীভাবে—এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। দেশ খাদ্যঘাটতিতে পড়বে।'
জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় শিশুদের স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও তিনি তীব্র নিন্দা জানান। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'করোনার সময় পড়াশোনা ব্যাহত হয়ে অনেক শিশু ড্রপআউট হয়ে গেছে। অনেকে বিপথে চলে গেছে। এখন আবার যদি একই পথে সরকার হাঁটে, তাহলে জাতিকে অন্ধত্ব ও মূর্খতার চাদরে ঢেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে। এটা রুখে দেওয়া হবে।'
অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য
সভায় বিশেষ অতিথি আইনজীবী এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, 'মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে সংস্কার বাস্তবায়ন করার জন্য। তবে সরকার এখন ১৬টি অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন না করার চিন্তা করছে। ১২ এপ্রিলের মধ্যে সনদ বাস্তবায়িত না করলে এর পরিণতি ভালো হবে না।'
প্রধান বক্তা জাগপা সভাপতি তাসমিয়া প্রধান বলেন, 'যাঁদের রক্তের বিনিময়ে দেশে পরিবর্তন এসেছে অনেকে মন্ত্রী-এমপি হয়ে তাঁদের ভুলে গেছেন। জুলাইয়ে তরুণেরা প্রাণ না দিলে এখনো লন্ডন থেকে অনেককে দল পরিচালনা করতে হতো। জুলাইকে অস্বীকার করলে দেশের মানুষ চব্বিশের মতো আরেকটা গণ-অভ্যুত্থান করবে। সেই অভ্যুত্থানে জাগপা পাশে থাকবে।'
জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান সভাপতির বক্তব্যে বলেন, 'বিএনপি নির্বাচনের আগে বলেছিল, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। এখন তারা গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করে দিতে চায়। তারা ৫১ শতাংশ জনসমর্থন পেয়ে ৭০ শতাংশ জনসমর্থনের গণভোট বাতিল করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।'
আলোচনা সভার সঞ্চালক ছিলেন যুব জাগপার সভাপতি নজরুল ইসলাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম অলিউল আনোয়ার। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য আসাদুর রহমান খান ও শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।



