ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী একবার তার সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেছিলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপি অভাবনীয় সাফল্য পেলেও পশ্চিমবঙ্গে কোনোভাবেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে না পারাটা তার জন্য কতটা বেদনাদায়ক। বাজপেয়ীর সেই কথার মধ্যে এক ধরনের গভীর যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল। কারণ বাংলা ছিল ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নিজের রাজ্য। তিনি ১৯৫১ সালে বিজেপির আগের রূপ ‘ভারতীয় জনসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়া বাজপেয়ী তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিনগুলোতে এই জনসংঘের গঠনমূলক সময়ে ড. মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করে রাজনীতিতে হাতেখড়ি নিয়েছিলেন।
বাংলায় সম্ভাব্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন
পশ্চিমবঙ্গে ভোট শেষ, সোমবার গণনার পর ফল ঘোষণা শুরু হবে। বুথফেরত জরিপে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। এমন অবস্থায় অনেকেই মনে করছেন, বিজেপি হয়তো বাংলায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। দলটি এবার শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সবাই মনে করছে বিজেপি এবার তাদের ২০২১ সালের পারফরম্যান্সের চেয়ে অনেক ভালো ফল করবে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে মাত্র ৩টি আসন পাওয়া বিজেপি ২০২১ সালে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ৭৭টি আসনে জয়ী হয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্ন
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটিই বড় প্রশ্ন ঘুরছে, ২০২৬ সালের নির্বাচন কি ২০০৬ সালের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি ২০১১ সালের মতো কোনও পরিবর্তন নিয়ে আসবে? এই একই প্রশ্ন নিয়ে এখন কলকাতার অভিজাত পার্ক স্ট্রিটের ১৯২৭ সাল থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে ফ্লুরিস থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের সাধারণ চায়ের দোকানেও তুমুল আলোচনা চলছে।
২০০৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেছিলেন যে তিনি বাম ফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবেন। কিন্তু জ্যোতি বসুর স্থলাভিষিক্ত হওয়া তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাম ফ্রন্টকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয়ের দিকে নিয়ে যান এবং বামেদের আসন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৫-এ। তবে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের জেরে খুব দ্রুতই সেই চিত্রনাট্য বদলে যায়। এই আন্দোলন মমতাকে সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ এনে দেয় এবং এর ঠিক পাঁচ বছর পর, অর্থাৎ ২০১১ সালে বাম শাসনের অবসান ঘটে।
বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামো ও তৃণমূলের দুর্বলতা
বাজপেয়ী যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিজেপি আজ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের সেই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে পাঁচ সদস্যের ‘মন্ডল শক্তি কেন্দ্র’ বুথ স্তরে ভোটারদের একত্রিত করতে কাজ করে থাকে। যদিও অনেকে এখনও মনে করেন, সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকে বিজেপি এখনও তৃণমূলের মতো ততটা শক্তিশালী নয়। তবে রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ধনী-দরিদ্র, গ্রামীণ ও শহুরে, সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের অসন্তোষ স্পষ্ট। সরকারের সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তার অন্যতম প্রধান প্রকল্প (লক্ষ্মীর ভাণ্ডার), যা গ্রামের এবং বস্তির বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। তা নিয়ে এক গৃহবধূ নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মাসে ১৫০০ টাকা দিয়ে কী লাভ? আমার মেয়ের একটা চাকরি দরকার, যেখানে সে অন্তত ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারবে, যাতে সে ভালোভাবে বাঁচতে পারে।
বিজেপি নেতৃত্ব কেবল কর্মসংস্থানের অভাব কিংবা রাজ্যে শিল্প ও বিনিয়োগ আনতে তৃণমূল সরকারের ব্যর্থতার ওপরই ভরসা করছে না। তারা তৃণমূলের হয়ে কাজ করা স্থানীয় যুবকদের এক অনানুষ্ঠানিক ‘তৃণমূল ব্যবস্থার’ বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভকেও কাজে লাগাতে চাইছে। ক্লাব বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আদলে চলা এই যুবকেরা কারও বাড়ি মেরামতের চুক্তি থেকে শুরু করে ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দেওয়া কিংবা মানুষকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখার মতো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকে। এই ‘ব্যবস্থা’ বাম আমলেও সক্রিয় ছিল এবং তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর দলের নেতারা এই ব্যবস্থার হাল ধরেন। তবে এবার বিজেপি এই ব্যবস্থায় ফাটল ধরাতে পেরেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অভিজ্ঞ মহল মনে করছে, তৃণমূলের সব কর্মী আজ আর দলটির হয়ে কাজ করছেন না।
হিন্দু ভোট একীকরণ ও মুসলিম তোষণের অভিযোগ
দ্বিতীয়ত, বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি মুসলিম তোষণের অভিযোগ এনেছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো হিন্দু ভোট একীভূত করে ফায়দা তোলার কৌশলেই তারা এমনটি করেছে। দলটির অনুপ্রবেশকারী বিরোধী স্লোগান রাজ্যের কিছু অংশের হিন্দু ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
অনেকে মনে করেন, দেশভাগের মতো ঐতিহাসিক কারণে পশ্চিমবঙ্গের অভিজাত ও উচ্চবর্ণের ‘ভদ্রলোক’ সমাজসহ কিছু বাঙালির মধ্যে এক ধরনের সুপ্ত মুসলিম-বিরোধী মনোভাব কাজ করে। তবে এতদিন পর্যন্ত তা প্রকাশ করা রাজনৈতিকভাবে সঠিক বলে মনে করা হতো না। কিন্তু এখন একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ভাষায়, ‘সেই পুরোনো ছাঁচ ভেঙে যাচ্ছে’। তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মুসলিম নারীরাও স্বীকার করেছেন যে, ‘আগে যেখানে কোনও হিন্দু-মুসলিম রেষারেষি ছিল না, এখন তা ক্রমশ বাড়ছে।’
তবে এখনও পর্যন্ত এই বিভাজন সেই মাত্রায় পৌঁছায়নি বা হিন্দি বলয়ের মতো আক্রমণাত্মক হিন্দুত্বের রূপ নেয়নি। কারণ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ধর্ম অনেক বেশি সমন্বিত। এটি শক্তি সাধনা ও মা কালীর পূজা এবং স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের আদর্শের মতো বিভিন্ন ধারার দ্বারা প্রভাবিত। এই রাজ্যে ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রায়শই একে অপরের পরিপূরক, যেখানে দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, বরং এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে এই লড়াইকে বাঙালি পরিচয় রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরেছেন, সেখানে বাংলার এই লড়াই একদিক থেকে বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং তৃণমূল নেত্রীর বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে এক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। মমতা বারবার জনগণকে এই বার্তা দিচ্ছেন যাতে বিজেপি ‘দিল্লি থেকে’ এই রাজ্য পরিচালনা করতে না পারে।
বিজেপির প্রচারণা ও দুর্বলতা
আগের নির্বাচনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বিজেপি তাদের প্রধান জনসভাগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিন্দিভাষী বক্তাদের মাঠে নামানো থেকে বিরত থেকেছে। তবে প্রচারের শেষ দিকে এসে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ এবং যোগী আদিত্যনাথ বাংলায় প্রচার চালিয়েছেন। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ভূপেন্দ্র যাদব গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করেছেন; তাকে কোনও পোস্টার, ইন্টারভিউ বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দেখা যায়নি।
তবে বিজেপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তাদের প্রচারণার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এবং রাজ্যের মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মতো কোনও বাঙালি মুখ নেই। সাধারণ মানুষের কথোপকথনেও এই লড়াইটি মূলত ‘দিদি বনাম মোদি’র লড়াই হিসেবেই উঠে এসেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও অনিশ্চিত ফল
২০২১ সালের নির্বাচনটি মূলত একটি রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে লড়া হয়েছিল। কিন্তু এবার এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ার কারণে এই লড়াইটি বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে ভোটার বাদ যাওয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় বিজেপির সমর্থনের বিপরীতে জনগণের ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এটি এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চিত বিষয়।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস



