পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে। প্রথমবার বিধানসভায় আসা বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬০ জন বিধায়কের একটি দল নিজেদেকেই 'আসল তৃণমূল' হিসেবে দাবি করছে। রাজ্য রাজনীতির এই নাটকীয় পরিস্থিতিকে অনেকেই ভারতের মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও এনসিপির ভাঙনের সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ার একই ধরনের সংকট তৈরি করেছিলেন।
তবে রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন হলো, ঋতব্রত কোনও শিন্ডে বা পাওয়ারের মতো জনপ্রিয় নেতা নন। তাহলে নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মমতার মতো প্রতাপশালী নেত্রীর বিরুদ্ধে ৬০ জন বিধায়ককে তিনি কীভাবে এক সুতায় গাঁথলেন? টানা তিন মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা রাজনৈতিকভাবে অপরাজেয় মনে হওয়া একটি দলে এত দ্রুত কীভাবে এই ধস নামলো?
যেভাবে শুরু এই সংকট
তৃণমূলের এই সংকটের মূলে রয়েছে দলের প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা (এলওপি) হিসেবে মনোনীত করার একটি চিঠি। অভিযোগ উঠেছে, ওই চিঠিতে তৃণমূল নিজেদের বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করেছে। বিধায়ক সন্দীপন সাহা ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভা সচিবালয়ে এই নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর পরপরই বিতর্কটি প্রকাশ্যে আসে।
অভিযোগ জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করে তৃণমূল। এর মাঝেই গুঞ্জন ওঠে, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল উভয় আমলেই একবার করে রাজ্যসভায় যাওয়া ঋতব্রত দল ভেঙে নিজেকে 'আসল তৃণমূল' দাবি করার চেষ্টা করছেন।
তৃণমূলের জন্য এই বিপদের ইঙ্গিত অবশ্য আগে থেকেই ছিল। গত সপ্তাহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে ডাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এড়িয়ে যান ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই। এমনকি গত মঙ্গলবার নির্বাচনের ধাক্কা কাটিয়ে মমতার ডাকা প্রথম সড়ক আন্দোলনেও মাত্র ৮ জন বিধায়ক এবং ৬ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন, যা দলের ভেতরের তীব্র অসন্তোষকে স্পষ্ট করে দেয়।
বুধবার বিদ্রোহী দলটি স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে ঋতব্রতকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সমর্থন জানিয়ে ৬০ জন বিধায়কের স্বাক্ষর জমা দেয়। তবে কাহিনীর সবচেয়ে বড় মোড় আসে তখন, যখন বিদ্রোহীরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই তাদের মূল দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। এক বিদ্রোহী বিধায়ক গণমাধ্যমকে বলেন, 'আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছি না। আমরা দল ভেঙে আলাদা দলও গড়ছি না। আমরা তৃণমূলের পতাকার নিচেই কাজ করব।'
শিন্ডে বা পাওয়ারের বিদ্রোহের সঙ্গে তফাত কোথায়?
একনাথ শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের মতো হেভিওয়েট নেতাদের ক্ষেত্রেও দল ভাঙতে মাসের পর মাস সময় লেগেছিল। শিবসেনার ক্ষেত্রে অসন্তোষের বীজ বোনা হয়েছিল ২০১৯ সালে, যখন উদ্ধব ঠাকরে সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের কংগ্রেস ও এনসিপির সঙ্গে জোট করে সরকার গড়েন। দলের কর্মী-সমর্থকেরা একে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের পরিপন্থি একটি অস্বস্তিকর জোট হিসেবে দেখেছিলেন। দুই বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পর ২০২২ সালে শিন্ডে ৪০ জন বিধায়ক নিয়ে বিদ্রোহ করেন।
এখানে মূল ইস্যু হলো 'রাজনৈতিক আদর্শ'। শিবসেনা বা এনসিপি নির্দিষ্ট আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল বলেই দল ভাঙার পরও কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ উদ্ধব ঠাকরে ও শরদ পাওয়ারের প্রতি অনুগত ছিল।
কিন্তু তৃণমূলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে মমতার হাত ধরে গড়ে ওঠা এই দলটিতে কখনোই কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের বালাই ছিল না। ফলে ঋতব্রত এবং ৫৭ জন বিধায়কের এই বিদ্রোহ আদর্শ বা গণসমর্থন থেকে আসেনি; এটি মূলত তৈরি হয়েছে দলীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে মমতার ভাইপো ও লোকসভা সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তীব্র ক্ষোভ থেকে।
আদর্শহীন ও আনুগত্যহীন তৃণমূল
বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের একটা বড় অংশের নেতা-কর্মীরা কখনোই আদর্শ বা অন্ধ আনুগত্যের সুতোয় দলের সঙ্গে বাঁধা ছিলেন না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও যখন হাওয়া উঠেছিল যে তৃণমূল হেরে যেতে পারে, তখন মুকুল রায় বা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শীর্ষ নেতারা দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। আবার তৃণমূল বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পর তারা একে একে দলে ফিরে আসেন।
বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকেরা বিদ্রোহের চেয়ে 'অভ্যুত্থান' হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সায়ন্তন ঘোষ এক টুইটে লিখেছেন, বিজেপি এখানে তৃণমূলের ভেতরে কোনও শক্তিশালী আদর্শিক গোষ্ঠী তৈরি করছে না; তারা এমন একদল মানুষকে জড়ো করছে যাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো আনুগত্যের অভাব।
এই পুরো অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তৃণমূলের কার্যত 'নাম্বার টু' অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক নেতার অভিযোগ, রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আই-প্যাক-এর সহায়তায় অভিষেক যখন থেকে দলের কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন, তখন থেকে নিজের দলের ওপর মমতার নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। তবে অভিষেক দলের ভেতর ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করলেও তার কোনও গণভিত্তি ছিল না। ফলে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতাদের ক্ষোভ মমতার চেয়ে অভিষেকের ওপরেই বেশি পড়েছে।
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আরপি সিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক দীর্ঘ পোস্টে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, তৃণমূল মূলত আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার লোভে এক ছিল। তিনি বলেন, 'শাসনব্যবস্থার কোনও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৃণমূলকে এক করে রাখেনি, রেখেছিল ক্ষমতার আকর্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতিই দলটির অলিখিত আদর্শ এবং আঠা হিসেবে কাজ করেছে, যা ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের নেতাদের একসঙ্গে ধরে রেখেছিল। যতদিন ক্ষমতা সুরক্ষিত ছিল, এই আঠা কাজ করেছে। কিন্তু যখনই দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এই আঠার জোর কমতে শুরু করেছে।'
বর্তমান পরিস্থিতিতে বল এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোর্টে। বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপ মমতাকে একটি কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তিনি কি ভাইপো অভিষেকের পক্ষ নেবেন, নাকি ঋতব্রতের নেতৃত্বাধীন এই বিশাল গোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াবেন? কোনও আদর্শিক টান ছাড়া এই চরম সংকটে মমতা কি আবারও নিজেকে 'আঠা' হিসেবে প্রমাণ করে দলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।



