জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের দাবি করেছেন, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তার সবগুলোই ছিল ‘সাজানো এবং পূর্বনির্ধারিত’। এমনকি ২০২৬ সালের সর্বশেষ নির্বাচনটিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য
শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে নিজের দু’টি বইয়ের প্রকাশনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
ভোটার ও বুথের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
জিএম কাদের বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল প্রায় ১২ কোটি, তখন ভোট বুথ ছিল ২ লাখ ৬১ হাজার। অথচ ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ বেড়ে ১২ কোটি ৭৭ লাখ হলেও বুথ কমিয়ে করা হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫৯টি। প্রায় ১৭ হাজার বুথ কেন কমানো হলো? ওনারা জানতেন যে, মানুষ ভোট দিতে আসবে না। তাই কৃত্রিম ভিড় দেখাতে এবং পরবর্তীতে ভোট ম্যানিপুলেট করতেই এই চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
ভোট পড়ার হার নিয়ে গাণিতিক বিশ্লেষণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমিশন ঘোষিত ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোট পড়ার দাবিকে ‘সম্পূর্ণ অসম্ভব’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ১৩ কোটি ভোটারের ৫৯% অর্থাৎ প্রায় ৭ কোটি ৫৯ লাখ ভোট পড়েছে বলা হচ্ছে। এই ভোট যদি নির্ধারিত বুথ সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়, তবে প্রতি বুথে ৩১০টি করে ভোট পড়ে। ৯ ঘণ্টার (৫৪০ মিনিট) সময়সীমায় প্রতি ভোটারের জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ১০৪ সেকেন্ড। এই ১০৪ সেকেন্ডের মধ্যে একজন ভোটারের আইডি চেক করা, আঙুলে কালি দেওয়া, ব্যালট পেপার নিয়ে বুথে ঢোকা, দুটি ব্যালটে সিল মারা, ভাঁজ করা এবং ব্যালট বক্সে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়; যদি না এক সেকেন্ডের জন্যও বুথ খালি থাকে।
তিনি দাবি করেন, সাংবাদিক ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী বেশিরভাগ কেন্দ্রই অর্ধেকের বেশি সময় খালি ছিল। বাস্তবে ১২ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। বাকি সাড়ে ৫ কোটি ভুয়া ভোট নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অভিযোগ
সাবেক এই বিরোধীদলীয় নেতা আরও অভিযোগ করে বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই এবং মিডিয়া এখন ‘সেলফ সেন্সরড’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণে চলছে। তিনি বলেন, আমার এই সত্য কথা ও গাণিতিক হিসাব দেশের কোনো পত্রিকা ছাপতে সাহস পায়নি। তাই বাধ্য হয়ে আমি এগুলো ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাপিয়েছি।
গ্রেফতারের প্রতিবাদ
আনিস আলমগীর ও পান্নাদের মতো গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের গ্রেফতারের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আগের অপশাসনের যে কন্টিনিউয়েশন (ধারাবাহিকতা), আমরা এখনো সেটাই দেখতে পাচ্ছি। মানুষের বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দুর্নীতি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও দেশে তীব্র দুর্নীতি চলেছে দাবি করে জিএম কাদের বলেন, বর্তমানে দেশজুড়ে এক অভিনব ‘মামলা বাণিজ্য’ শুরু হয়েছে। নিরীহ মানুষকে মামলার ভয় দেখিয়ে এবং ‘শোন অ্যারেস্ট’ (গ্রেফতার দেখানো) থেকে বাঁচানোর নাম করে বিভিন্ন স্তরে বড় অংকের টাকা ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে জাতীয় পার্টি বা ভিন্নমতাবলম্বী কারও নাম থাকলেই দোষর আখ্যা দিয়ে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হচ্ছে এবং পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আওয়ামী লীগ ও বর্তমান সরকারের সমালোচনা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, শেখ হাসিনা ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের বিশাল পরিবর্তন করেছিলেন, কিন্তু সবাইকে বাদ দিয়ে করায় তা টেকেনি। একইভাবে বর্তমান সরকারও যদি দেশের অর্ধেক রাজনৈতিক শক্তি ও সাধারণ মানুষকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্টাইলে সংস্কার বা বিচার করতে চায়, তবে সেই সংস্কারও বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো টিকবে না।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, লাঙ্গল প্রতীক থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। মামলা চলছে। হয়তো নিয়ে যাবে। কিন্তু দলের ভেতরে থেকে যারা বেইমানি করবে, তাদের আর সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা জনগণের পক্ষে একা হলেও লড়াই চালিয়ে যাব।
অনুষ্ঠানের অন্যান্য বক্তা
প্রকাশক আলমগীর সিকদার লোটনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলা একাডেমির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। এছাড়া আরো বক্তৃতা করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুস সাত্তার, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, সাংবাদিক কাজী রওনক হোসেন, মঞ্জুরুল হাসান পান্না, মাসুদ কামাল ও আনিস আলমগীর প্রমুখ।



