বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইউএই সিদ্ধান্তের অপেক্ষা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনতে ইউএই সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আমিরাত সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

বেনজীর আহমেদের সর্বশেষ অবস্থান

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র বাংলাদেশ সরকারের ইতিমধ্যে পাঠিয়েছে। ইউএই গভর্মন্টের (সরকার) তরফ থেকে আমাদের এখনো কিছু জানানো হয়নি। আশা করি, শিগগির জানানো হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন ইউএই গভর্নমেন্টের (সরকার) রিপ্লাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। তাঁর (বেনজীর আহমেদ) সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানি, ফেডারেল পুলিশের কাছেই আছে; তাঁদের হেফাজতেই আছে। অন্য কোনো সংবাদ আমি জানি না।’

সীমান্তে পুশ-ইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অব্যাহত ‘পুশ-ইন’ ঠেকাতে মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে আছে। কাউকেই জোর করে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান করলে তাঁর পরিচয় যাচাই করে দুই দেশের প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা আছে। তবে জাতীয়তা যাচাই ছাড়া কাউকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভারত সরকার যদি বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা দেয়, তাহলে বাংলাদেশ আইনগত প্রক্রিয়ায় তাঁদের পরিচয় যাচাই করে গ্রহণ করবে। কিন্তু জোর করে কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর সুযোগ নেই। যথাযথ যাচাই ছাড়া কাউকে পাঠানোর চেষ্টা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হাদি হত্যা মামলার আসামি প্রত্যর্পণ

ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী।

মাদক মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল

এর আগে অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে মাদকের বিস্তার রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও জোরদার করা হবে। এ লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংশোধিত আইনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আধুনিক অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যাতে তাঁরা সশস্ত্র মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা বিপুলসংখ্যক মাদক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর মাদক কারবার মোকাবিলা

মাদক কারবার এখন প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল লেনদেন ও মোবাইল আর্থিক সেবার অপব্যবহারের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা ও অর্থ পাচার পরিচালিত হচ্ছে। এসব অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী নয়। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস শনাক্ত, অবৈধ সম্পদ জব্দ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে নতুন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় আধুনিক মাদক পরীক্ষাগার স্থাপন, ডগ স্কোয়াড গঠন, মাদক শনাক্তকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাদকাসক্তদের রোগী হিসেবে চিকিৎসা

সরকারের লক্ষ্য শুধু মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তার নয়, একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, মাদকাসক্তদের অপরাধী নয়, রোগী হিসেবে বিবেচনা করে তাঁদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশকে জুয়া ও মাদকমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় আইন, অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

মাদকবিরোধী অভিযান ও পরিসংখ্যান

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। দেশে মাদকের বিস্তার রোধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে অধিদপ্তর কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশে ৩০ হাজার ৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৯ হাজার ২৯১টি মামলা করা হয়েছে। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৯ হাজার ৬৮৫ জন। মাদক ব্যবসার মূল অর্থদাতাদের বিরুদ্ধেও মানি লন্ডারিং আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং আইনে ৯টি মামলার মাধ্যমে প্রায় ২২ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীদের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকিতে আছে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের অনুপ্রবেশ এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে গাঁজা, হেরোইন ও বিভিন্ন সিনথেটিক মাদকের প্রবাহ দেশের জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব মাদক কম খরচে উৎপাদন করা যায় এবং সহজে শনাক্তও করা যায় না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, মাদক প্রতিরোধে সরবরাহ হ্রাস, চাহিদা হ্রাস ও ক্ষতি হ্রাস—এই তিন ভিত্তির ওপর সরকার সমন্বিত কৌশলে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক মাদক দিবসের তাৎপর্য

বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশে প্রতিবছর ২৬ জুন ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ উদ্‌যাপিত হয়। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মাদকমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ প্রবলেম: পার্সিস্টেন্ট ইস্যুজ, নিউ চ্যালেঞ্জেস, ইনোভেটিভ রেসপন্সেস’।

পুরস্কার বিতরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম

অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ২১ শিক্ষার্থী, তিন কর্মকর্তা এবং তিনটি মাদক নিরাময়কেন্দ্রকে পুরস্কার দেওয়া হয়। আলোচনা সভার আগে মাদকবিরোধী শোভাযাত্রা হয়। সভার শুরুতে ‘মাদককে না বলুন’ শিরোনামে অধিদপ্তরের থিম সং এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নির্মিত সচেতনতামূলক ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।