শরীয়তপুর আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা ও হেনস্তার অভিযোগ
শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা দেওয়া ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। গত রোববার সকাল থেকে তাঁরা আইনজীবী সমিতি ভবন ঘিরে রেখে এই বাধা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষিত হয়েছেন, যা আইনজীবী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সমিতির গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
চলতি বছরের নির্বাচনের তফসিল ২ এপ্রিল ঘোষণা করা হয়, যেখানে ২৫ এপ্রিল ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারিত ছিল। গত রোববার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের দিনে সমিতি ভবনের নিচতলার হলরুমে নির্বাচন কমিশন বসে। এই সময় দরজার সামনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা অবস্থান নেন এবং ভবনের বাইরে দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা জড়ো হন। তাঁদের স্লোগান ও বাধার মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
আওয়ামী লীগ ও অন্য দলের সমর্থক আইনজীবীদের চেম্বারে গিয়ে হুমকি ও গালিগালাজের অভিযোগও পাওয়া গেছে। বাধা উপেক্ষা করে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে গেলে প্রবীণ আইনজীবী মোসলেম উদ্দিন খানকে হেনস্তা করা হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আইনজীবী সংগঠনের নেতা মুরাদ হোসেন মুন্সীকেও তাঁর চেম্বারে ঢুকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয় ও সমালোচনা
এ পরিস্থিতিতে ১৫টি পদের বিপরীতে বিএনপিপন্থী প্যানেলের ১৫ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন এবং সেদিন রাতেই তাঁদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ঘটনার পর নবীন ও প্রবীণ আইনজীবী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। নতুন তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত একটি পেশাজীবী সংগঠনে গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হওয়া দুঃখজনক। বহিরাগতদের উপস্থিতিতে আইনজীবীদের অধিকার খর্ব ও হেনস্তার ঘটনাকে তাঁরা ‘ঘৃণিত’ বলে উল্লেখ করেন।
অতীতের ঘটনা ও বর্তমান প্রতিক্রিয়া
গত বছরও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, যখন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা অন্য প্যানেলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা দেন এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষিত হন। আইনজীবী সমিতি সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর নির্বাচনের মাধ্যমে ১৫ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের ধারাবাহিকতা ছিল। বর্তমানে সমিতিতে ভোটার রয়েছেন ২৬২ জন এবং তালিকাভুক্ত আইনজীবীর সংখ্যা প্রায় ৪০০। প্রবীণ আইনজীবীরা বলেন, চার দশকের বেশি সময়ের ইতিহাসে কখনো প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা দেওয়া বা আইনজীবীদের হেনস্তার মতো ঘটনা ঘটেনি। অতীতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা সমন্বয়কারী আইনজীবী রুহুল আমিন বলেন, তাঁদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি। তাঁরা এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে আইনজীবীদের নিয়ে সভা ডেকে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান। গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইনজীবী ফিরোজ আহমেদ বলেন, এ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী এবং বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে জানানো হবে।
তবে বর্তমান কমিটি বা নতুন নির্বাচিত কমিটির কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নতুন কমিটির এক নেতা বলেন, পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁরা বিব্রত। তাঁর ভাষায়, ‘এখন মনে হচ্ছে, প্রক্রিয়াটি সঠিক হয়নি। বাইরে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আমাদের লজ্জিত হতে হয়।’



