গণতন্ত্রে দল নিষিদ্ধকরণ: একটি নীতিগত দ্বিধা
একটি কার্যকর গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো রাজনৈতিক দলের অবাধ কার্যক্রম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। রাজনীতিতে ‘দল নিষিদ্ধ’ শুনলেই অনেকের মনে প্রথমে আসে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার যুক্তি—রাষ্ট্র বলবে, সমাজকে রক্ষা করতে কঠোর হতে হয়। কিন্তু গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল কেবল সংগঠন নয়, এটি নাগরিকের মত প্রকাশ, সংগঠিত হওয়া এবং প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার প্রধান সেতু। তাই একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে নিষিদ্ধ করা মানে—একসঙ্গে সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং প্রতিনিধিত্বের জায়গা সংকুচিত করা।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে। বর্তমান সরকার সেই একই অধ্যাদেশকে কোনও পরিবর্তন ছাড়াই আইনে রূপান্তর করেছে। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি বর্তমান বিএনপি সরকার বিল আকারে পাসের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
নতুন এই আইনের ফলে কোনও ব্যক্তি বা ‘সত্তা’ (রাজনৈতিক দল) যদি সন্ত্রাসী কাজে জড়িত থাকে, তবে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারবে। এর আওতায় দলটির সভা-সমাবেশ, মিছিল, এমনকি অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও ধরনের প্রচারণাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আইনের বিস্তৃত প্রভাব ও গণতান্ত্রিক ঝুঁকি
কথা হলো, ‘আইন করে ফেললাম’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অধিকার সীমিত করার আইন যদি খুব বিস্তৃত হয়—যেমন সংগঠনের সব কার্যক্রম, প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, বক্তব্য, প্রকাশনা—একসঙ্গে বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেটি কেবল দলকে নয়, সমাজের রাজনৈতিক কথাবার্তাকেও স্তব্ধ করতে পারে। OSCE/ODIHR ও ভেনিস কমিশনের রাজনৈতিক দল সংক্রান্ত নির্দেশিকাগুলো তাই বারবার জোর দেয় রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, সমতা, বৈষম্যহীনতা এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার ওপর—কারণ দলীয় পরিসর সংকুচিত হলে গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে দুর্বল হয়।
এখানে সবচেয়ে ধারালো প্রশ্নটা ‘অনুপাতিকতা’—ঝুঁকি যতটা, প্রতিকারও ততটাই কি? গণতান্ত্রিক নীতিতে সাধারণ নিয়ম হলো: অপরাধ হলে ব্যক্তিভিত্তিক দায় নির্ধারণ, বিচার, এবং শাস্তি। সংগঠনের ভেতরে কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হতে পারে; অর্থায়নে অনিয়ম হলে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ হতে পারে; সহিংসতার প্রমাণ থাকলে নির্দিষ্ট বেআইনি কাঠামো ভাঙা যেতে পারে। কিন্তু পুরো রাজনৈতিক পরিসর বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ সাধারণত ‘শেষ অবলম্বন’ হিসেবে বিবেচ্য—কারণ এটি সমষ্টিগত শাস্তির ঝুঁকি তৈরি করে এবং নিরপরাধ সদস্য-সমর্থকও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
বিএনপি সরকারের ভূমিকা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভেনিস কমিশনের দল নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত নির্দেশনা এই কারণেই বলে—বিচারিক প্রক্রিয়া, কঠোর প্রমাণমান এবং কম সীমাবদ্ধ বিকল্প আগে যাচাই করা উচিত। প্রশ্ন হলো ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি কী করেছে? নাকি সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় এবং আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে ফিরতে না দিয়ে বিএনপি একটি ‘নির্ঝঞ্ঝাট রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ উপভোগ করতে চাইছে?
‘মিলিট্যান্ট ডেমোক্রেসি’ তত্ত্ব বলে একটা তত্ত্ব আছে, যেখানে গণতন্ত্রকে গণতন্ত্রবিরোধীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে কিছু রাষ্ট্রকে কখনও কখনও আগেভাগে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে, যদি প্রমাণ হয় কোনও রাজনৈতিক শক্তি গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য বাস্তবায়নের বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করেছে। কিন্তু একই ধারায় সতর্কতাও আছে: ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ যুক্তি যেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দমনের ঢাল না হয়। তাই অবশ্যই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে প্রমাণ করতে হবে, দল নিষিদ্ধের এই ঝুঁকির বাস্তবতা, প্রমাণের মান এবং সিদ্ধান্তের অনুপাতিকতা, যার একটাও বিএনপি করেছে বলে মনে হয় না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সতর্কবার্তা
যদি কেউ ভাবেন, ‘দল নিষিদ্ধ’ হলেই গণতন্ত্র নিরাপদ—তাহলে জার্মান সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা একটি ঠান্ডা সতর্কবার্তা হতে পারে। জার্মান ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত দল নিষিদ্ধকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র বললেও একে একইসঙ্গে ‘দ্বিমুখী’ বলেছে—কারণ এটি শত্রুকে ঠেকাতে পারে, আবার ভুল প্রয়োগে বহুত্ববাদ ও আইনের শাসন ভেঙে গণতন্ত্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এখানেই আসল শিক্ষা: গণতন্ত্র বাঁচাতে গিয়ে গণতন্ত্রের নিয়ম ভাঙা খুব সহজ; পরে সেই নিয়ম ফেরত আনা খুব কঠিন।
বড় রাজনৈতিক শক্তি নিষিদ্ধ হলে প্রথম যে ক্ষতি চোখে পড়ে, তা হলো প্রতিনিধিত্বের সংকট। বড় দল মানে বড় ভোটভিত্তি—সেই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পছন্দ সংসদ, স্থানীয় সরকার, নীতিনির্ধারণে প্রকাশ পায়। দল নিষিদ্ধ হলে এক ধরনের রাজনৈতিক ‘শূন্যতা’ তৈরি হয়: বিরোধী মত দুর্বল হয়, জবাবদিহি কমে, আর নির্বাচন অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক না থেকে আনুষ্ঠানিক হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে। OSCE/ODIHR–ভেনিস কমিশনের গাইডলাইনগুলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও দলীয় সমতাকে গণতন্ত্রের শর্ত বলেই ধরে—কারণ কার্যকরবিরোধী শক্তি ছাড়া ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কম প্রশ্নের মুখে পড়ে।
দল নিষিদ্ধকরণের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি
অপরদিকে আজ যে বিধান দিয়ে আওয়ামী লীগকে মাঠের বাইরে রাখা হলো, কাল তারা সরকার গঠন করলে একই বিধান দিয়ে বিএনপি ও তার সাবেক জোটসঙ্গীদের রাজনৈতিক কার্যক্রমের বাইরে রাখতে পারে। এই ‘precedent effect’ গণতন্ত্রকে ধীরে ধীরে এমন এক পথে নেয়, যেখানে রাজনীতির সীমা ঠিক করে দেয় ক্ষমতাধররা, নিয়ম নয়। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দল নিষিদ্ধকরণে কেবল ফল নয়, প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দেয়—স্বাধীন বিচারিক তদারকি, স্বচ্ছ শুনানি, স্পষ্ট আইন এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাস্তব প্রতিকার। এসব দুর্বল হলে আইন নিরাপত্তার বদলে, রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, যা এই ক্ষেত্রে প্রবল ভাবে হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে রাজনীতি সংকুচিত হলে দলটি সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি হারায় না নিঃসন্দেহে বলা যায়। অনেক সময় এসব ক্ষেত্রে শুধু রূপ বদলায়। নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী হলে, এই বৃহৎ রাজনৈতিক দলটিকে সংঘাতের দিকে কিংবা প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা থেকে গোপন নেটওয়ার্ক, ছদ্ম সংগঠন বা অনানুষ্ঠানিক শক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে সহিংসতা কমার নিশ্চয়তা নেই, বরং সংঘাতের প্রকৃতি আরও অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে। তাই নিরাপত্তার যুক্তি সত্যিই মুখ্য হলে ‘কম ক্ষতিকর কিন্তু কার্যকর’ বিকল্প—ব্যক্তি দায়ে বিচার, সহিংসতার নির্দিষ্ট কাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অর্থায়ন স্বচ্ছতা, আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা এসবকে আগে পরীক্ষা করাই যুক্তিসঙ্গত।
দল নিষিদ্ধকরণের শর্ত ও গণতান্ত্রিক মূল্য
এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন: তাহলে কি দল নিষিদ্ধ কখনও করা যাবে না? যাবে—কিন্তু শর্ত কঠোর। গণতন্ত্র নিজের আত্মরক্ষা করতে পারে; তবে আত্মরক্ষার নামে যা খুশি তা করতে পারে না। সিদ্ধান্তকে টিকিয়ে রাখে চারটি জিনিস—আইনের স্পষ্টতা, শক্ত প্রমাণ, অনুপাতিকতা, এবং স্বাধীন আদালতের কঠোর নজরদারি। ICCPR-এর “necessary in a democratic society” মানদণ্ড, আর ভেনিস কমিশন ও OSCE/ODIHR-এর নির্দেশনাগুলো মূলত এই ন্যূনতম শর্তগুলোই স্মরণ করিয়ে দেয়। সোজা কথা: রাষ্ট্রকে শক্তিশালী হতে হবে, কিন্তু তার শক্তি যেন নিয়মের ভেতরে থাকে; না হলে গণতন্ত্রকে বাঁচানোর দোহাই দিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটাই বেশি হয়।
শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক শক্তি নিষিদ্ধকরণ একটি নীতিগত দ্বিধা—শৃঙ্খলা বনাম স্বাধীনতা, নিরাপত্তা বনাম বহুত্ববাদ। কিন্তু এই দ্বিধার ভেতরেও একটি পরিষ্কার সতর্কতা আছে: যে গণতন্ত্রবিরোধী মতকে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় ধরে রাখতে পারে না, সে গণতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকে না। দল নিষিদ্ধের মতো সিদ্ধান্ত তাই ‘তৎক্ষণাৎ সমাধান’ মনে হলেও এর গণতান্ত্রিক মূল্য—প্রতিনিধিত্ব, আস্থা, প্রতিযোগিতা খুব চড়া হতে পারে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই গণতন্ত্র রক্ষা করতে চায়, তাকে প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে—বিচার, প্রক্রিয়া ও প্রমাণ—সবই যেন প্রশ্নাতীতভাবে ন্যায্য হয়। কারণ ‘দ্বিমুখী অস্ত্র’ দিয়ে শত্রুকে আঘাত করা সহজ, কিন্তু গণতন্ত্রকে ভুল করে কেটে বসলে সেই ক্ষত সারানো সবচেয়ে কঠিন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।



