গাজীপুরের শ্রীপুরে যুবক হত্যা: ঋণ নিয়ে বিরোধ, প্রধান আসামির স্বীকারোক্তি
গাজীপুরের শ্রীপুরে অজ্ঞাত এক যুবককে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় পুলিশ ছয় জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে প্রধান আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) শ্রীপুর থানার ওসি মোহাম্মদ নাসির আহমদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেফতার ও অভিযানের বিস্তারিত
গাজীপুরের শ্রীপুর এবং ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা থানার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করে। সোমবার তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আতিকুর রহমান (২৩), যিনি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার কামালপুর গ্রামের তাইজুল ইসলামের ছেলে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের তালিকা নিম্নরূপ:
- ইমরান হাসান (২৪), ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বাগুয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে
- টুটুল হাসান (২০), শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ী গ্রামের আমিনুল ইসলামের ছেলে
- নাজমুল (৩৫), একই ইউনিয়নের মুলাইদ গ্রামের আব্দুল আলীর ছেলে
- কামাল হোসেন (৩২), টেপিরবাড়ী গ্রামের আব্দুল সামাদের ছেলে
- রুহানুল ইসলাম রুহান (২৩), আবুল কাসেমের ছেলে
- আকবর (২৯), মুলাইদ গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে
হত্যার পেছনের কারণ ও ঘটনার ক্রম
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার এসআই লাল চাঁন মিয়া জানান, ভুক্তভোগী আতিকুর রহমান তার নিজের নামে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে প্রধান আসামি নাজমুলের পরিচালিত একটি সমিতি থেকে লক্ষাধিক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণের টাকা পরিশোধ না করে আতিকুর রহমান তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গা ঢাকা দেন।
২৭ ফেব্রুয়ারি আসামিরা আতিকুর রহমানের অবস্থান শনাক্ত করে তাকে ধরে শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ গ্রামে নাজমুলের বাড়িতে আটক করে রাখে। ওই দিন দিবাগত রাতে আসামিরা তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে কাঁঠাল পাতা ভর্তি একটি বস্তায় ঢুকিয়ে এমসি বাজার-সাতখামাইর সড়কের সাইটালিয়া চৌরাস্তা মোড় সংলগ্ন বৃন্দাবন এলাকার গজারি বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কের পাশে রেখে বস্তায় পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
লাশ আবিষ্কার ও তদন্তের অগ্রগতি
পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে স্থানীয়রা সড়কের পাশে অজ্ঞাত যুবকের পোড়া লাশ পড়ে থাকতে দেখে থানায় খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশের সুরতহাল পরীক্ষা করে গলায় কাপড়ের পোড়া অংশবিশেষ প্যাঁচানো এবং গলায় চন্দ্রাকৃতির দাগ দেখতে পায়। ভুক্তভোগীর দুই হাতের আঙুলগুলো কাটা থাকায় এবং পুড়ে যাওয়ায় আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশটি অজ্ঞাত হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায়, শ্রীপুর থানা পুলিশ গাজীপুরের শ্রীপুর এবং ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আতিকুর রহমান হত্যায় জড়িত ছয় জনকে গ্রেফতার করে। প্রধান আসামি ইমরান হাসান হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে স্থানীয়রা গজারি বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কের পাশে অজ্ঞাত যুবকের পোড়া লাশ দেখে তেলিহাটি ইউনিয়নের টেংরা গ্রামের গ্রাম পুলিশ সদস্য শরিফ মিয়ার মাধ্যমে থানায় খবর দেন। প্রাথমিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত করতে না পেরে পুলিশ ময়নাতদন্ত শেষে অজ্ঞাত হিসেবে মামলা রুজু করে, যা পরবর্তীতে বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।



