কানাডার নোভা স্কশিয়ায় গত গ্রীষ্মে দাবানলের ভয়াবহতার মধ্যে কর্তৃপক্ষ বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার ভাষা ও সংজ্ঞা নিয়ে সৃষ্টি হয় চরম বিভ্রান্তি। সম্প্রতি নোভা স্কশিয়া সুপ্রিম কোর্ট এই নিষেধাজ্ঞাটিকে শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং কানাডার অধিকার ও স্বাধীনতার চার্টারের পরিপন্থি বলে রায় দিয়েছে। আদালত সতর্ক করে বলেছে, যদি ব্যক্তিগত অধিকারগুলো সুরক্ষিত না থাকে, তবে তা এমনভাবে ক্ষয় হতে পারে যা শেষ পর্যন্ত সবাইকে প্রভাবিত করবে।
সেনার জরিমানা চ্যালেঞ্জ
এই আদেশের ফলে বিপাকে পড়েন জেফরি ইভেলি নামের এক সেনা। তিনি এই নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং কেপ ব্রেটন ফরেস্টে প্রবেশ করেন। এর ফলে তাকে ২৮ হাজার ৮৭২ কানাডিয়ান ডলার জরিমানা করা হয়। জাস্টিস সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল ফ্রিডমস (জেসিসিএফ)-এর সহায়তায় তিনি আদালতে এই জরিমানার বিরুদ্ধে লড়াই করেন ও জয়ী হন।
আইনি পরামর্শদাতার প্রতিক্রিয়া
জেসিসিএফ-এর আইনি পরামর্শদাতা মার্টি মুর বলেন, এই রায় সরকারের জন্য ‘লজ্জাজনক’ এবং এটি ভবিষ্যতে কাউকে অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে নিরুৎসাহিত করবে। তিনি আরও বলেন, ‘নোভা স্কশিয়ায় পা না রাখলে বোঝা কঠিন যে সেখানে চলাচলের নিষেধাজ্ঞা কেমন প্রভাব ফেলে। কারণ, নোভা স্কশিয়া মানেই হলো বন।’
আদালতের পর্যবেক্ষণ
আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, সাধারণ মানুষের জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কর্তৃপক্ষ বন সংলগ্ন শিল্পগোষ্ঠী, যেমন-বন অপারেটর, ইউটিলিটি এবং টেলিকম কোম্পানিগুলোকে বন ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। বিচারক ক্যাম্পবেল লিখেছেন, ‘যাদের দায়িত্ব ছিল সুরক্ষা দেওয়া, তাদের কিছু না কিছু করতে হতো। তাদের দ্রুত কাজ করতে হতো এবং তাদের বিকল্প ছিল সীমিত।’ তবে এসব সত্ত্বেও তিনি ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞা বনাম কাণ্ড জ্ঞান
গত গ্রীষ্মে দাবানল যখন নোভা স্কশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের বনে না যেতে অনুরোধ জারি করেছিল। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অনুরোধটি কঠোর নিষেধাজ্ঞায় রূপ নেয়। বন বা ঝোপঝাড়ের নিচে হাঁটার সময় ধরা পড়লে ২৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার জরিমানার বিধান রাখা হয়, যা একজন কর্মীর গড় বার্ষিক আয়ের অর্ধেকেরও বেশি।
কিন্তু সমস্যাটি ছিল ‘বন’ (woods) বলতে আসলে কী বোঝায়, তা নিয়ে। কর্তৃপক্ষের সংজ্ঞায় পাথুরে জমি, ঝোপঝাড় বা জলাভূমিকেও ‘বন’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিলো। এমনকি সেখানে গাছ থাকুক বা না থাকুক, যদি প্রমাণ পাওয়া যেত যে অতীতে সেখানে গাছ ছিল, তবে সেটিও ‘বন’-এর আওতায় পড়ত।
এ বিষয়ে মামলার বিচারক জাস্টিন জেমি ক্যাম্পবেল এক পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘যিনি বন থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন, তাকে বিষয়টি নিয়ে অনেকটা অনুমান বা ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। সরকার চেয়েছিল মানুষ যেন কাণ্ড জ্ঞান (কমন সেন্স) ব্যবহার করে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাটি কাণ্ড জ্ঞানের সংজ্ঞাকেই যেন অস্বীকার করছিল।’
আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ
বিচারক ক্যাম্পবেল গত সপ্তাহে রায়ে উল্লেখ করেন, এই আদেশটি এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে এর কোনও ব্যাখ্যাই সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “যারা ভেবেছিলেন তারা জানেন বন কী, তাদের কাছে ‘বনে প্রবেশ করবেন না’, কথাটি যৌক্তিক মনে হতে পারত।”
বিচারক রায়ে আরও বলেন, সরকার নোভা স্কশিয়ার বাসিন্দাদের চলাচলের অধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং আগুন নেভানোর চেষ্টার বিপরীতে এই লঙ্ঘনের ব্যায়ভার কতটা তা পরিমাপ করতে ব্যর্থ হয়েছে। চলাচলের অধিকার একটি সুরক্ষিত অধিকার এবং আদালতের মতে এটি ‘একজন মুক্ত মানুষের হওয়ার মূল হৃদস্পন্দন’। সরকার এই অধিকার সীমাবদ্ধ করতে পারে, তবে আদালত মনে করে এক্ষেত্রে ‘যৌক্তিক’ বিবেচনার অভাব ছিল।
সরকারের সাফাই ও চ্যালেঞ্জ
নোভা স্কশিয়ার প্রিমিয়ার টিম হিউস্টন তার সরকারের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রিমিয়ার হিসেবে অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের সহায়তা করতে, মানুষকে নিরাপদ রাখতে এবং সম্পত্তি রক্ষায় আমি যা প্রয়োজনীয় মনে করেছি, তা করেছি। সেই মুহূর্তে আমার কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে এটি পুরোপুরি যথাযথ ছিল।’



