নতুন সরকারের পথ কঠিন: অর্থনীতি, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের পথ কঠিন: অর্থনীতি, সুশাসন ও চ্যালেঞ্জ

গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হলেও নতুন সরকারের সামনের পথটি অত্যন্ত কঠিন। সরকারের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের শক্তিশালী সমর্থন বা ম্যান্ডেট রয়েছে। তবু সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তা নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসভিত্তিক অলাভজনক বৈশ্বিক বেসরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বুধবার এক প্রতিবেদনে এ কথা বলেছে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

প্রতিষ্ঠানটির মতে, বিএনপির উচিত নির্বাচনের পরে শুরুর এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি, সুশাসন এবং নিরাপত্তা সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। ইরান সংঘাতের কারণে উদ্ভূত অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলা করা একটি বড় পরীক্ষা হবে। বিএনপির উচিত হবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। এই নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ১৮ মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন ছিল একটি বড় পরীক্ষা। সহিংসতায় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ভোট গ্রহণ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এর পাঁচ দিন পর ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

নতুন সরকারের সামনে এখন ব্যাপক সংস্কারের জন-প্রত্যাশা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূলে থাকা বিরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে পরিবার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাব সামাল দেওয়া। সরকার জনসমর্থন ধরে রাখতে চাইলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নও করতে হবে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে রাজনৈতিক সংস্কারের একটি বড় অংশ বাস্তবায়ন এবং জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে।

অনেক বাংলাদেশির কাছে এই নির্বাচনের গুরুত্ব কেবল ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ২০০৮ সালের পর প্রথম বারের মতো অর্থবহ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়াটাও ছিল বড় বিষয়। ঐ বছরেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। পরবর্তী সময়ে তার সরকার তিনটি অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে, যেগুলো বিরোধী দলের বর্জন, ভোটারদের কম উপস্থিতি এবং ব্যাপক অনিয়মের জন্য সমালোচিত হয়েছিল। দেশের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের একটি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলেও, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে অধিকাংশ ভোটার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়ের সমাপ্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যে দেশটি এখনো শেখ হাসিনার কঠোর শাসনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় শেষ হয়েছে। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই প্রশাসন দেশকে স্থিতিশীল করতে কাজ করেছিল, যখন অর্থনীতি ছিল টালমাটাল এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তাদের ঘোষিত তিনটি অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে তারা অংশত সফল হয়েছে- রাজনৈতিক সংস্কার; ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ও এর আগে হাসিনার শাসনামলে বিরোধীদের ওপর চালানো নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর। তবে আমলাতান্ত্রিক বাধার কারণে কিছু লক্ষ্য অর্জনে এই প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য বজায় রাখতে তাদের আপসও করতে হয়েছে।

নির্বাচনি ফলাফল ও রাজনৈতিক গতিশীলতা

এদিকে নির্বাচনি ফলাফলে দেখা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রত্যাশার চেয়ে পরিবর্তন কম হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৬টিতে জয়ী হয়েছে। এমনকি এই আসনগুলো পেতেও তাদের বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেওয়া আসন সমঝোতা করতে হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে। দেশের বৃহত্তম এই ইসলামপন্থি দলটি এবার তাদের ইতিহাসে সেরা নির্বাচনি ফলাফল করেছে। অন্যদিকে, জয়ী দল বিএনপি, যারা আওয়ামী লীগের বহুদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যাদের আগের শাসনামলে আলোচিত-সমালোচিত কর্মকাণ্ড রয়েছে, তারা ২০৯টি আসন পেয়েছে।

এরপরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় জুলাই সনদ নামে পরিচিত সংস্কার প্যাকেজের অনুমোদনে। জুলাই সনদের কোন বিধানগুলো শেষ পর্যন্ত বিএনপি বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, চূড়ান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত কিছু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের বিষয়ে দলটির আপত্তি রয়েছে। পরিস্থিতি যা-ই হোক, অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর মনোযোগ দিতে সরকারের উচিত হবে জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য

এর মধ্যে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সামনের মাসগুলোতে অর্থনীতিকে সঠিক পথে রাখা। ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, জিডিপি (মোট দেশজ উত্পাদন) প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি এমন একটি অর্থনীতির ওপর নতুন আঘাত হিসেবে আসবে, যা শেখ হাসিনার সরকারের আমলের অব্যবস্থাপনা থেকে এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই পরিস্থিতি লাখ লাখ বাংলাদেশির জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলবে। একই সঙ্গে, বিএনপিকে প্রশাসনিক সংস্কারের বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে; বিশেষ করে দুর্নীতি মোকাবিলা ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করার মাধ্যমে। এর অংশ হিসেবে অধিকতর প্রশিক্ষিত ও কার্যকর পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলারও প্রয়োজন রয়েছে।

বিএনপি সরকারকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত্ সংক্রান্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়টিও মোকাবিলা করতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কথা বিবেচনা করলে, আওয়ামী লীগের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ভারতের সঙ্গে দলটির ঘনিষ্ঠ সমপর্ক এবং এর জ্যেষ্ঠ নেতাদের অধিকাংশ ভারতে নির্বাসনে থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নয়াদিল্লির উচিত তাদের প্রভাব ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে এমন পদক্ষেপ নিতে উত্সাহিত করা, যা শেষ পর্যন্ত দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ সুগম করতে পারে। ভারতের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুনর্গঠন করা বিএনপি সরকারের জন্য সামগ্রিকভাবেই একটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে বড় এই প্রতিবেশীর সঙ্গে সমপর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গেও ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। বিএনপির জন্য এই সময়টুকু অত্যন্ত সংবেদনশীল।