শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রাক্তন প্রেস সচিব কাফি খান তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন, তাঁর কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় জিয়াউর রহমানের গুণাবলি অতুলনীয়। তিনি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষ ছিলেন, যিনি দেশকে ভালোবাসতেন, স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দিতেন না, দিনরাত কাজ করতেন এবং সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করতেন। কাফি খান বলেন, জিয়ার মতো আরও কয়েকজন মানুষ পাওয়া গেলে দেশের চেহারা পাল্টে দেওয়া যেত।
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও প্রেস সচিব নিয়োগ
কাফি খান একজন প্রখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার আগে ও পরে তিনি ভয়েস অব আমেরিকায় (ভিওএ) কাজ করেছেন এবং দেশের রেডিও-টেলিভিশনে খবর পড়েছেন। তিনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং লেখালেখির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি মারা যান। ২০১১ সালে বাংলাদেশে বেড়াতে এলে কাফি খানের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় ‘কিংবদন্তির জিয়া’ বইয়ের জন্য।
কাফি খান বলেন, ১৯৭৭ সালে বঙ্গভবন থেকে ফোন এসে জানানো হয় রাষ্ট্রপতি জিয়া তাঁর সঙ্গে কফি খেতে চান। সাক্ষাতে জিয়া তাঁর আমেরিকায় বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করার কথা জানতে চান এবং দেশের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান। দুই মাস পর শামসুল হুদা চৌধুরী তাঁকে জানান, রাষ্ট্রপতি তাঁকে প্রেস সচিব বানাতে চান। ১৯৭৭ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি প্রেস সচিব হিসেবে যোগ দেন।
জিয়াউর রহমানের কর্মনিষ্ঠা ও দেশপ্রেম
কাফি খান বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন প্রচণ্ড কাজপাগল মানুষ। তিনি বছরের ৩৬৫ দিন কাজ করতেন এবং তাঁর টিমকেও কাজে লাগাতেন। তাঁর দৈনন্দিন কর্মসূচি শুরু হতো সকাল ৭টায় এবং রাত ২টায় বাসায় ফিরতেন। তিনি মাত্র চার ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না। দেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল। তিনি বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করতে চেয়েছিলেন এবং খাদ্যে স্বনির্ভরতার জন্য খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছিলেন। জিয়া নিজে কোদাল হাতে মাটি কেটে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন।
স্বজনপ্রীতি ও সততার উদাহরণ
কাফি খান বলেন, স্বজনপ্রীতি শব্দটা জিয়ার অভিধানে ছিল না। তিনি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতেন না। নিজের পরিবারের জন্য তিনি কিছুই করেননি। তাঁর ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পায়ে ছেঁড়া জুতা ছিল, কিন্তু জিয়া নতুন জুতা কিনে দিতে দেরি করতেন। একটি পুরোনো হাতঘড়ি তিনি ব্যবহার করতেন, যা হারিয়ে গেলে তিনি অনেক আফসোস করেছিলেন। বিদেশ সফরে প্রাপ্ত উপহার তিনি তোশাখানায় জমা দিতেন। কর্নেল আনিসের চোরাই ইলেকট্রনিক পণ্য আনার ঘটনায় জিয়া তাঁর টিমের লাগেজ চেকিংয়ের নির্দেশ দিয়ে আনিসকে বরখাস্ত করেন।
কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্মান
জিয়াউর রহমান একজন গ্রেট স্টেটসম্যান ছিলেন। তিনি বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলেন। যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো এবং কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে সমান তালে কথা বলতে পারতেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি মধ্যস্থতা করেছিলেন এবং দুই দেশের জনগণ ও সরকারের আস্থা অর্জন করেছিলেন। তাঁর শাহাদাতের পর ইরাকের লোকজন বলেছিলেন, জিয়ার মৃত্যুতে যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র
কাফি খান বলেন, জিয়াউর রহমানের একটি অসাধারণ কাজ হলো দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করা। তিনি বাকশালের একদলীয় শাসনের পর গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন। তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটি তাঁর প্রিয় ছিল। তিনি শিশুদের জন্য ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় শিশু পুরস্কার, জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার, স্বাধীনতা ও একুশে পদক এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তন করেন। তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ একটি বিশাল রাজনৈতিক দল।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাত
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়া শাহাদাতবরণ করেন। ওই দিন সকালে কাফি খান রেডিও অফিসে খবর পড়তে যান এবং জিয়ার চট্টগ্রাম সফরের খবরটি নিউজ ভ্যালু না থাকায় বাদ দেন। পরে বঙ্গভবনে এসে জিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে তিনি কান্না থামাতে পারেননি।
কাফি খান বলেন, জিয়াউর রহমানের সততা, দেশপ্রেম ও কর্মনিষ্ঠা অতুলনীয়। তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক মানুষ ছিলেন, যিনি দেশের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।



