সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন: এক বছরের ব্যবধানে ৬৯১২ কল, ৪৮ অভিযোগ নিষ্পত্তি
সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন: ৬৯১২ কল, ৪৮ অভিযোগ নিষ্পত্তি

উচ্চ আদালত থেকে জামিন আদেশের পরও প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে ছিলেন এক আসামি। অক্ষরজ্ঞানহীন ওই আসামির স্বজনদের যোগাযোগের অভাব এবং মামলার জামিন সংক্রান্ত নথির প্রক্রিয়াগত জটিলতায় তিনি যোগাযোগ করেন সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত হেল্পলাইন নম্বরে। ফোনে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদারকি শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। কয়েক দিনের মধ্যেই হাইকোর্টের আদেশের অনুলিপি কারাগারে পৌঁছালে কারামুক্ত হন তিনি। এভাবে আরও অসংখ্য বিচারপ্রার্থী বিচার বিভাগ থেকে তাদের প্রাপ্ত অধিকার বুঝে নিতে বেছে নিচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের হেল্পলাইনের সুবিধা।

হেল্পলাইন সেবার সূচনা ও সম্প্রসারণ

২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নির্দেশে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ওই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন’ সেবা চালু করে। পরবর্তীকালে হেল্পলাইন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে কোর্ট প্রশাসন ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন সেন্টার উদ্বোধন করে। একইসঙ্গে আগের দুটি হেল্পলাইন নম্বর ০১৩১৬-১৫৪২১৬ এবং ০১৭৯৫-৩৭৩৬৮০ (কল ও হোয়াটসঅ্যাপ সার্ভিস) এর পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন নম্বর ‘১০৩’ চালু করা হয়। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতি রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই হেল্পলাইন সার্ভিস চালু রাখা হয়।

যেসব নম্বরে পাওয়া যাবে সুবিধা

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন নম্বর যথাক্রমে- ০১৩১৬-১৫৪২১৬ ও ০১৭৯৫-৩৭৩৬৮০ (কল ও হোয়াটসঅ্যাপ সার্ভিস) এবং ‘১০৩’-তে অনলাইন সার্ভিস চালু আছে। একইসঙ্গে ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও বিচারপ্রার্থীরা এ ধরনের সেবা পেতে পারেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হেল্পলাইনের আদলে দেশের ৬৪টি জেলা আদালত ও ৮টি মহানগর আদালতেও নিজস্ব হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। এসব হেল্পলাইনের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতারা সংশ্লিষ্ট আদালত সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করে উপকৃত হচ্ছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যেসব ক্ষেত্রে হেল্পলাইনের সুবিধা পাওয়া যাবে

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আগত কোনো বিচারপ্রার্থী বা সেবাগ্রহীতা সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো শাখায় সেবা গ্রহণে যেকোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলে বা সেবা গ্রহণ সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে অসুবিধার মুখোমুখি হলে সেবাগ্রহীতারা সুবিধা নিতে পারবেন। বিশেষ করে মামলার সর্বশেষ অবস্থা, আইনগত প্রাথমিক পরামর্শ, নথি অনুসন্ধান, অভিযোগ দাখিল ও প্রতিকার সেবাপ্রাপ্তিতে বিলম্বের অভিযোগ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কর্মক্ষেত্রে অসদাচরণ বা কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানানো, হারানো নথি উদ্ধার, প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ ও সাধারণ সহায়তা সেবাপ্রাপ্তির জটিলতা নিরসন, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, দেশব্যাপী জেলা আদালতের সেবা স্থানীয় আদালতের তথ্যবিষয়ক সহযোগিতা এই হেল্পলাইন থেকে পাওয়া যাবে।

হেল্পলাইনে প্রাপ্ত কলের পরিসংখ্যান

সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশ ও বিদেশ থেকে আইনি পরামর্শ, মামলা সম্পর্কিত তথ্য ও অভিযোগ দাখিল সংক্রান্ত মোট ৬ হাজার ৯১২টি কল এসেছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন সেন্টারে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশ এবং বিদেশ থেকে আইনি পরামর্শ, মামলা সম্পর্কিত তথ্য ও অভিযোগ দাখিল সংক্রান্ত মোট ২ হাজার ৯০৫টি কল আসে। এর মধ্যে আইনি পরামর্শ সেবা গ্রহণের কল ছিল ৩১৭টি এবং বিভিন্ন মামলা সংক্রান্ত তথ্য জানার বিষয়ে কল সংখ্যা ছিল ৫০৪টি। আর এসব তথ্যই সেবাগ্রহীতাদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

হেল্পলাইন নম্বরে উঠে এসেছে যেসব বিষয়

হেল্পলাইনে আসা মোট প্রাপ্ত কলের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা আদালত সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, বিলম্বে সেবাপ্রাপ্তি, অসদাচরণ ইত্যাদি সম্পর্কিত বিষয়ে বিগত চার মাসে মোট ৫৮টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে বিলম্বে আইনি সেবাপ্রাপ্তি, নথি নিখোঁজ ও দ্রুত নিষ্পত্তি সংক্রান্ত অভিযোগ আসে ৪৮টি। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, এই ৪৮টি অভিযোগ সমাধান করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১০টি অভিযোগ বিভিন্ন অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ ইত্যাদি সম্পর্কিত। এর মধ্যে উচ্চ আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে ১টি, জেলা আদালতের বিচারকের বিরুদ্ধে ৭টি (৩টি অভিযোগ প্রাথমিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়) এবং জেলা আদালতের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ২টি অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত ইতোমধ্যে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে।

জানা গেছে, মোট প্রাপ্ত কলের মধ্যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও শাখার কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বরাবর মোট ৩৫৪টি কল আসে। অভিযোগগুলো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার-বহির্ভূত হওয়ায় কী করণীয় সে বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হেল্পলাইন নম্বর ১০৩ থেকে সেবা গ্রহণের জন্য কল প্রদানকারী সেবাগ্রহীতার কোনো প্রত্যুত্তর (জবাব) পাওয়া যায়নি এমন কলের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৭২টি।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের হেল্পলাইন সেবা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই কার্যক্রম চলমান থাকবে। দেশের জনগণ ও বিচারপ্রার্থীরা যাতে এ সেবা গ্রহণ করে উপকৃত হন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সময়ে সময়ে এই সেবাকে আরও উন্নত করা হবে।”