শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিকন্দী গ্রাম। এই গ্রামেই ১৫৪ বছর ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে একটি সিনিয়র সিভিল জজ আদালত। ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ শাসকদের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই আদালতটি প্রথমে 'মুন্সেফ আদালত' নামে পরিচিত ছিল। দীর্ঘ এই সময় ধরে এখানে দেওয়ানি ও অন্যান্য মামলার বিচারকাজ অব্যাহত রয়েছে।
ইতিহাস ও পটভূমি
চিকন্দী সিনিয়র সিভিল জজ আদালত ও আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও মুন্সিগঞ্জের কিছু এলাকার মানুষের আইনি সেবা প্রদানের জন্য ১৮৬০ সালের দিকে পদ্মা নদীতে একটি ভ্রাম্যমাণ চৌকি আদালত চালু করা হয়। একটি জাহাজে করে নড়িয়া উপজেলার মুলফৎগঞ্জ এলাকায় এই আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে নদীভাঙনের কারণে আদালতটি সদর উপজেলার চিকন্দী এলাকায় স্থানান্তরিত হয়।
গ্রামে ১৮৭২ সালে একটি গোলপাতার ঘর তৈরি করে আদালতের কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে সেখানে দুটি ছোট পাকা ভবন নির্মিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাড়ে ১০ একর জমির ওপর আদালত এলাকা গড়ে ওঠে। ১৯২৬ সালে একতলা একটি আদালত ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেই ভবনের ৮টি কক্ষের মধ্যে সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের কার্যক্রম চলছে।
বর্তমান অবস্থা
শরীয়তপুর এলাকাটি পূর্বে ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালে শরীয়তপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হলে জেলা শহরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে জেলার চারটি উপজেলার দেওয়ানি মামলা পরিচালিত হলেও চিকন্দী আদালতে সদর ও জাজিরা উপজেলার দেওয়ানি মামলার বিচারকাজ চলতে থাকে। এই আদালতটি জেলা শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়নি।
শরীয়তপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফাহিমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, 'জেলা শহর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরত্বে একটি চৌকি আদালত ব্রিটিশ আমল থেকে আছে। এখনো আদালতটির কার্যক্রম চিকন্দী নামের একটি গ্রামে পরিচালিত হচ্ছে। ওই আদালতটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধীনে চলছে।'
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, পুরো এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ ও বনজ গাছ রয়েছে। মাছ চাষের দুটি পুকুরও রয়েছে। আদালত চত্বরে একটি মসজিদ, একতলা আদালত ভবন ও বিচারকদের থাকার জন্য একটি একতলা ভবন রয়েছে। পাশেই চিকন্দী আইনজীবী সমিতি ভবন ও আইনজীবীদের চেম্বার অবস্থিত।
বিচার কার্যক্রম
আমলি আদালতের বিচারকাজ ছাড়া চিকন্দীতে পারিবারিক আদালত, অর্থঋণ আদালত, আইনগত সহায়তা (লিগ্যাল এইড) ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম চলছে। আদালতটিতে দুজন বিচারক পদায়ন আছেন। তাঁদের একজন সদর ও আরেকজন জাজিরা আদালতে বিচারকাজ করেন। বিচারকাজ পরিচালনায় সহায়তার জন্য ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন।
আদালতের প্রশাসনিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে ৪ হাজার ৩০০ মামলার বিচারকাজ চলছে। প্রতিবছর ৫০০ থেকে ৬০০ মামলার বিচারকাজ শেষ হয় (রায়)।
পরিবর্তিত পরিবেশ
১৫৪ বছর আগে চিকন্দী এলাকাটি কীর্তিনাশা নদীর তীরবর্তী ছিল। বর্তমানে কীর্তিনাশা নদীর মূল প্রবাহ সাত-আট কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। এখন আর চিকন্দী নদীর চরাঞ্চল নেই। সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্রাম, হাটবাজার, উচ্চবিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোস্ট অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
জনমত
জাজিরার আক্কেল মাহমুদ মুন্সিকান্দি এলাকার লোকমান হোসেন মুন্সি জমিজমা নিয়ে একটি মামলা করেছেন চিকন্দী সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে। এক বছর ধরে তাঁর মামলার কার্যক্রম চলছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'মামলাটি এখন বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিটি তারিখেই বিচারক উপস্থিত ছিলেন। এ আদালতটি জেলা শহরে না হলেও যাতায়াতে তেমন কোনো সমস্যা হয় না।'
৩০ বছর ধরে আইন পেশায় কাজ করছেন আবদুল মান্নান তালুকদার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'চিকন্দীর এ আদালত ব্রিটিশরা স্থাপন করেছেন। পাকিস্তান-ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও আদালতটির কার্যক্রম চলেছে। জেলা স্থাপিত হওয়ার পরও এ আদালতের কার্যক্রম চিকন্দীতেই রাখা হয়েছে।'
নবীন আইনজীবী হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, 'চিকন্দী একটি গ্রাম। এখানে ব্রিটিশ শাসকদের প্রতিষ্ঠা করা একটি আদালত থাকায় পুরো এলাকাটির জীবনমান বদলে গেছে। এ আদালত ঐতিহ্য বহন করছে। এ আদালতের ক্যাম্পাসে খেলাধুলা করে, আদালতের পাশের স্কুলে পড়ালেখা করে শৈশব-কৈশোর পার করেছি। তাই আইন পেশায় পড়ালেখা করে এ আদালতেই কর্মজীবন শুরু করেছি।'
চিকন্দী আইনজীবী সমিতির সভাপতি রুবায়েত আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, 'আদালতটিতে মামলার জট নেই। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার হার খুবই ভালো। গ্রামে হলেও আদালতটিতে বিচারক, আইনজীবী ও সেবাপ্রার্থীরা নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে মামলার সেবা আদান-প্রদান করেন।'



