যুক্তরাজ্যের একটি আদালত ধর্ষণের দায়ে দোষী দুই কিশোরকে কারাদণ্ড না দিয়ে ‘কিশোর পুনর্বাসন আদেশ’ দিয়েছেন। বয়স কম হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী কিশোরী বলেছেন, বিচারকের এই রায় শুনে তার ‘মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে’।
ভুক্তভোগীর প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ সাংবাদিক লরা কুয়েন্সবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরী বলেন, ‘তাহলে আমাকে এসবের (বিচারের পুরো প্রক্রিয়া) মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কী মানে দাঁড়াল?’ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে নাম প্রকাশ না করে তিনি আরও বলেন, ‘বিচারকের সিদ্ধান্তে মনে হচ্ছে, ছেলেগুলোর কাজ হয়তো ঠিক ছিল না। কিন্তু তারা এখনো শিশু হওয়ায় আইনের চোখে যেন বিষয়টা ঠিকই আছে।’
ঘটনার বিবরণ
হ্যাম্পশায়ারের ফোর্ডিংব্রিজে অ্যাভন নদীর ধারে একটি আন্ডারপাসে ওই কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। তখন তার বয়স ছিল ১৫ বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ন্যাপচ্যাটে তার সঙ্গে ছেলেদের একজনের ‘সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে দেখা করতে যায় কিশোরী।
অভিযুক্ত দুই কিশোরের বর্তমান বয়স ১৫ বছর। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি মাঠে আরেক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগেও তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। দ্বিতীয় ধর্ষণের ঘটনায় ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরও দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ছেলেগুলো তাদের মোবাইল ফোনে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়।
বিচারকের বক্তব্য
সাউদাম্পটন ক্রাউন কোর্টে রায় ঘোষণার সময় বিচারক নিকোলাস রোল্যান্ড অপরাধটিকে ‘গুরুতর’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করার কারণে অপরাধটি আরও গুরুতর হয়েছে। তবে তিনি এই ‘অল্প বয়সী’ ছেলেদের ‘অপরাধী তকমা’ দেওয়া এড়াতে চান। তিনি তাদের প্রশংসা করে বলেন, বিচার চলাকালীন তারা ভালো আচরণ করেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিক্রিয়া
ভুক্তভোগী কিশোরী এবং তার পরিবার চায় রায় পরিবর্তন করে ছেলেদের কারাগারে পাঠানো হোক। তাদের মতে, এই শাস্তি অনেকটা ‘মৃদু ভর্ৎসনা’ করার মতো। কিশোরী বলেন, ‘আমি কেন আদালতে গিয়ে বসে থেকে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে এই যন্ত্রণা ভোগ করতে গেলাম? কেনইবা সবকিছু প্রমাণের জন্য আবার নতুন করে প্রকাশ করলাম?’
কিশোরীর মা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘দয়া করে সাহায্য করুন। এটা যদি আপনার মেয়ে, আপনার ভাতিজি, আপনার ছেলে, আপনার ভাতিজা, আপনার পরিবারের কেউ হতো, তাহলে কি আপনি খুশি হতেন?’ কিশোরীর সঙ্গী বলেন, বিচারকের সিদ্ধান্ত শোনার পর তিনি ‘শারীরিকভাবে অসুস্থ’ বোধ করছিলেন।
শাস্তির বিবরণ
রায়ে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে তিন বছরের কিশোর পুনর্বাসন আদেশ দেওয়া হয়। এর আওতায় দুই কিশোরীকে ধর্ষণ এবং দুটি অশালীন ছবি রাখার অভিযোগে তাকে ১৮০ দিন কঠোর নজরদারিতে থাকতে হবে। অপর ১৫ বছর বয়সী কিশোরকেও একই শাস্তি দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে দুই কিশোরীকে তিনবার করে ধর্ষণ এবং অশালীন ছবি তোলার চারটি অভিযোগ ছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারির হামলার ঘটনায় অন্য এক আসামিকে ধর্ষণে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরকে ১৮ মাসের কিশোর পুনর্বাসন আদেশ দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
রিফর্ম ইউকে পার্টির সংসদ সদস্য রবার্ট জেনরিক বলেন, এই রায়ে ন্যায়বিচার হয়নি। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো বিচারক চরম ভুল করে থাকেন, যা আমার মনে হয় এই মামলার ক্ষেত্রে ঘটেছে, তবে এর জন্য তাঁদের জবাবদিহি করা উচিত।’ কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনক শুক্রবার বলেন, এই ঘটনায় তিনি ‘অত্যন্ত মর্মাহত’। তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধ এর চেয়ে গুরুতর আর হতে পারে না, অথচ এর জন্য যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা আদতে কোনো শাস্তিই নয়।’
সরকারের পদক্ষেপ
যুক্তরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল রায়টি পর্যালোচনা করে দেখবেন। তিনি ২৮ দিনের মধ্যে আপিল আদালতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেবেন। সরকারের মন্ত্রী ড্যারেন জোনস বলেন, তিনি আশা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই বিষয়টি খুব জরুরি ভিত্তিতে দেখতে চাই।’
ইংল্যান্ডের চিলড্রেনস কমিশনার ডেম র্যাচেল ডি সুজা বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। তিনি বলেন, ‘আমি চাই না এ দেশের কোনো কিশোরী এমনটা ভাবুক যে, তার সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে এবং এর যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।’
সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন: ‘এই ভয়াবহ ঘটনার বিস্তারিত জেনে সাধারণ মানুষের মতো আমরাও গভীরভাবে মর্মাহত। এই কঠিন সময়ে আমরা ওই তরুণ ভুক্তভোগীদের পাশে আছি। আইন কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সতর্কতার সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে এই মামলাটি পর্যালোচনা করছেন।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার দুই কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় তিন কিশোরের কারাদণ্ড এড়ানোর ঘটনাটিকে ‘মর্মান্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি মর্মান্তিক ঘটনা। আইন কর্মকর্তারা যে জরুরি ভিত্তিতে এই রায় পুনর্বিবেচনা করছেন, তা অত্যন্ত সঠিক পদক্ষেপ।’



