পঞ্চম বলের কাল্পনিক ছবি: মিডিয়াম। রোজ সকালে যে এক গ্লাস দুধ বা এক বাটি দই দিয়ে আপনি নাস্তা সারছেন, তার ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যের সমাধান! কথাটি শুনতে সায়েন্স ফিকশনের মতো মনে হলেও, ঠিক এমনই এক রোমাঞ্চকর দাবি করেছেন সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখের কণা-পদার্থবিজ্ঞানী ডায়ানা ক্রেইক ও তাঁর দল। আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত অতি সাধারণ খনিজ উপাদান ক্যালসিয়াম পরমাণুর গভীরে উঁকি দিয়ে তাঁরা এক বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। তাকে প্রচলিত বিজ্ঞানের কোনো হিসাব-নিকাশ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। আর এই অভাবনীয় পর্যবেক্ষণের সূত্র ধরেই বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস—তাঁরা হয়তো মহাবিশ্বের সব সমীকরণ বদলে দেওয়া প্রকৃতির সেই অধরা পঞ্চম মৌলিক বলের খোঁজ পেয়ে গেছেন।
চার মৌলিক বলের স্ট্যান্ডার্ড মডেল
পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে আমরা জানি প্রকৃতিতে চারটি মৌলিক শক্তি বা বল রয়েছে। মহাকর্ষ, বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল, শক্তিশালী নিউক্লিয় বল এবং দুর্বল নিউক্লিয় বল। এই চারটি বল মিলেই মহাবিশ্বের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। তারা কেন জ্বলে, গ্রহ কেন ঘোরে, পরমাণু কেন ভাঙে না — সবকিছুর পেছনে এই চার শক্তির খেলা। বিজ্ঞানীরা এই চার বলকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় বেঁধেছেন, যার নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল। মডেলটি এতই নিখুঁত যে দশকের পর দশক ধরে প্রতিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তা টিকে আছে।
আরও পড়ুন: প্রকৃতির মৌলিক বল চারটি কী কী (১২ মার্চ ২০২৫)। পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে প্রকৃতিতে চারটি মৌলিক শক্তি বা বল রয়েছে। মহাকর্ষ, বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল, শক্তিশালী নিউক্লিয় বল এবং দুর্বল নিউক্লিয় বল।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ করে আসছিলেন যে এই ছবিটা সম্পূর্ণ নয়। মহাবিশ্বে এমন অনেক কিছু আছে, যা এই চার বল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। গুপ্তবস্তু বা ডার্ক ম্যাটারের কথাই ধরা যাক। মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে যার অস্তিত্ব আছে বলে ধারণা করা হয়। অথচ সরাসরি কেউ কখনো দেখেনি। আবার ডার্ক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি নামের আরেক রহস্যময় শক্তি মহাবিশ্বকে ক্রমশ প্রসারিত করে চলেছে বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। সেটাও রয়ে গেছে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরে। এই ফাঁকগুলো পূরণ করতে হলে হয়তো দরকার একটি নতুন বল। সেটাই পঞ্চম বল।
কণা ত্বরণযন্ত্রের সীমাবদ্ধতা
এর খোঁজেই বিজ্ঞানীরা কাজ করে আসছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিল্যাব এবং সুইজারল্যান্ডের সার্নের মতো বিশাল কণা ত্বরণযন্ত্রে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি কণাকে আলোর কাছাকাছি গতিতে একে অপরের সাথে সংঘর্ষ ঘটানো হয়েছে। প্রতিটি সংঘর্ষের পর কী তৈরি হয়, তা খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। এই পরীক্ষাগুলো থেকে পাওয়া ফলাফল স্ট্যান্ডার্ড মডেলের পূর্বাভাষ থেকে কিছুটা আলাদা বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু তা যথেষ্ট জোরালো ছিল না। প্রমাণটা অধরাই থেকে যাচ্ছিল।
সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখের ডায়ানা ক্রেইক এবং তাঁর সহকর্মীরা ভিন্ন পথে হাঁটলেন। বিশাল কণা ত্বরণযন্ত্রের বদলে তাঁরা বেছে নিলেন একটি সূক্ষ্ম ও নিখুঁত পদ্ধতি। একে বলা হয় আইসোটোপ শিফট স্পেকট্রোস্কোপি। এই পদ্ধতিতে বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত পরমাণু বা আয়নকে শক্তিশালী চুম্বকীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে রাখা হয়। একে বলে আয়ন ট্র্যাপ। তারপর সেই আটকে থাকা পরমাণুর উপর লেজার রশ্মি ছোড়া হয়।
আরও পড়ুন: বল নয়, গর্ত (১০ আগস্ট ২০২৪)। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিল্যাব এবং সুইজারল্যান্ডের সার্নের মতো বিশাল কণা ত্বরণযন্ত্রে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি কণাকে আলোর কাছাকাছি গতিতে একে অপরের সাথে সংঘর্ষ ঘটানো হয়েছে।
আইসোটোপ শিফট স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষা
পরীক্ষাটা একটু বিস্তারিত বুঝলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস—যার ভেতর থাকে প্রোটন ও নিউট্রন কণা। আর তাকে ঘিরে বিভিন্ন কক্ষপথে ইলেকট্রন ঘুরতে থাকে। ইলেকট্রনের প্রতিটি কক্ষপথের নিজস্ব শক্তিস্তর আছে। পরমাণুর উপর লেজারের আলো পড়লে ইলেকট্রন সেই আলোর শক্তি শুষে নিয়ে উচ্চতর শক্তিস্তরে লাফ দেয়। কিন্তু এই উত্তেজিত অবস্থা বেশিক্ষণ থাকে না। ইলেকট্রন আবার নিজের স্বাভাবিক জায়গায় ফিরে আসে। তখন শোষিত সেই অতিরিক্ত শক্তিটুকু একটি আলোকণা বা ফোটন হিসেবে ছেড়ে দেয় বা নিঃসরণ করে। এই ফোটনের শক্তি মেপেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন পরমাণুর ভেতরে ঠিক কী ঘটছে।
ক্রেইকের দল বিভিন্ন ক্যালসিয়াম আইসোটোপের উপর এই পরীক্ষা চালালেন। আইসোটোপ মানে হলো একই মৌলের পরমাণু, কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা আলাদা। তাঁরা যা আশা করেছিলেন, পরিমাপের ফলাফল স্ট্যান্ডার্ড মডেলের হিসেবের সাথে মিলবে। কিন্তু মিলল না। ডায়ানা ক্রেইকের ভাষায়, কোনোভাবেই আমরা যা আশা করেছিলাম, তা দেখলাম না। সেটা ছিল আমাদের সবার জন্য খুবই রোমাঞ্চকর ব্যাপার।
এই পরীক্ষার একটি বিশেষ দিক হলো এর অসাধারণ নির্ভুলতা। ক্রেইকের দল এর আগের যেকোনো একই ধরনের পরীক্ষার চেয়ে একশো গুণ বেশি নির্ভুলতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। এই মাত্রার নির্ভুলতায় পরীক্ষা করতে গিয়েই তাঁরা দেখলেন, ফোটনে যে শক্তি পাওয়া যাচ্ছে, তা চার পরিচিত শক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মানে পরমাণুর ভেতরে কোনো অজানা বল কাজ করছে, যা ইলেকট্রনকে প্রভাবিত করছে।
আরও পড়ুন: অদ্ভুতুড়ে কেন্দ্রবিমুখী বল: কাল্পনিক, নাকি বাস্তব (০৬ নভেম্বর ২০২৪)। ইলেকট্রনের প্রতিটি কক্ষপথের নিজস্ব শক্তিস্তর আছে। পরমাণুর উপর লেজারের আলো পড়লে ইলেকট্রন সেই আলোর শক্তি শুষে নিয়ে উচ্চতর শক্তিস্তরে লাফ দেয়।
স্বাধীন গবেষণা দল দ্বারা যাচাই
ক্রেইক প্রথমে নিজেও সন্দিহান ছিলেন। কারণ বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি জানেন যে এ ধরনের ফলাফলের পেছনে যন্ত্রপাতির ত্রুটি, হিসেবের ভুল বা পরিমাপে কোনো গণ্ডগোল থাকতে পারে। তাই তিনি তাঁর তথ্য নিয়ে গেলেন আরও দুটো স্বাধীন গবেষণা দলের কাছে। জার্মানির ন্যাশনাল মেট্রোলজি ইনস্টিটিউট ক্যালসিয়াম আইসোটোপ দিয়ে আলাদাভাবে মাপজোক করল। ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট ফর ফিজিকস পরীক্ষা করে দেখল, ক্যালসিয়াম আইসোটোপের ভর ঠিকঠাক আছে কিনা। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান দল গোটা পরীক্ষার ডেটা ও হিসেবনিকেশ নতুন করে খতিয়ে দেখল। তিনটি দলই একমত হলো—ফলাফল ঠিকই আছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল দিয়ে এই ফলাফল ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে ক্রেইকের ভাষ্য, ‘যত বেশি পরিমাপ করা যায়, তত বেশি নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞান এই ফলাফল ব্যাখ্যা করতে পারছে না। আমরা বারবার একটি অজানা প্রভাব দেখতে পাচ্ছিলাম।’
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আবিষ্কার কি সত্যিই পঞ্চম বলের প্রমাণ?
সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি
বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে বেশ সতর্কভাবে কথা বলছেন। ডায়ানা ক্রেইক নিজেও সরাসরি দাবি করছেন না যে তিনি পঞ্চম বল আবিষ্কার করেছেন। দায়িত্বশীল বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি বলছেন, তাঁরা এমন কিছু দেখছেন, যা প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে। তিনি জানান, ‘একজন গবেষক হিসেবে আপনাকে সবসময় ধরে নিতে হয় যে আপনি কিছু নতুন পাবেন না, আপনার যন্ত্রপাতি যা দেখাচ্ছে, তাই লিখে রাখবেন। কিন্তু যখন তথ্য নতুন কিছু ইঙ্গিত করে, তখন সতর্কভাবে যাচাই করতে হয়।’ তবে তিনি এটুকু বলতে রাজি, ‘আমরা এমন পর্যায়ে এসে গেছি, যেখানে আমাদের বুঝতে হবে আমরা যা দেখছি তার কারণ কী—এটা কি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা, নাকি স্ট্যান্ডার্ড মডেলে কোথাও ফাঁক আছে।’
আরও পড়ুন: রহস্যময় মহাকর্ষ বল (২৯ মার্চ ২০২৫)। ক্রেইকের ভাষ্যমতে, ‘যত বেশি পরিমাপ করা যায়, তত বেশি নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞান এই ফলাফল ব্যাখ্যা করতে পারছে না। আমরা বারবার একটি অজানা প্রভাব দেখতে পাচ্ছিলাম।’
পঞ্চম বলের সম্ভাব্য প্রকৃতি
পঞ্চম বল কেমন হতে পারে, তা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে নানা তত্ত্ব চালু আছে। এর মধ্যে একটি ধারণা হলো, এই বল কোনো নতুন কণার মাধ্যমে কাজ করতে পারে। চারটি পরিচিত শক্তির প্রতিটি নির্দিষ্ট কণার মাধ্যমে কাজ করে—বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল কাজ করে ফোটনের মাধ্যমে, শক্তিশালী নিউক্লিয় বলের বাহক গ্লুওন, দুর্বল নিউক্লিয় বলের বাহক ডব্লিউ ও জেড বোসন। মহাকর্ষের ক্ষেত্রে ধারণা করা হয় গ্র্যাভিটন নামের একটি কাল্পনিক কণার কথা বলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরাসরি এরকম কোনো কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়নি। পঞ্চম বলের এরকম একটি কণা থাকতে পারে। সেই কণাটিকে বলা হচ্ছে ইউকাওয়া পার্টিকল। জাপানের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও নোবেলজয়ী হিদেকি ইউকাওয়ার নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর তত্ত্বের সাথে মিল রেখে এই কণাটিকে প্রকাশ করা হচ্ছে ফাই (Φ) চিহ্ন দিয়ে।
এই পঞ্চম বল কীভাবে কাজ করতে পারে? এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের ধারণা, নতুন এ বলটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও তাকে ঘিরে ঘোরা ইলেকট্রনের মধ্যে একটি অতিরিক্ত আকর্ষণ বা বিকর্ষণ তৈরি করে। কিছু গবেষক মনে করছেন, এই বল ইলেকট্রনকে পরমাণুর কেন্দ্রের দিকে আরও টানতে পারে, আবার অন্যরা মনে করছেন এটি তাদের দূরেও ঠেলতে পারে। এই দোদুল্যমানতার কারণেই হয়তো পর্যবেক্ষণে বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: দুর্বল নিউক্লীয় বল কী, এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ (১২ নভেম্বর ২০২৫)। চারটি পরিচিত শক্তির প্রতিটি নির্দিষ্ট কণার মাধ্যমে কাজ করে—বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল কাজ করে ফোটনের মাধ্যমে, শক্তিশালী নিউক্লিয় বলের বাহক গ্লুওন, দুর্বল নিউক্লিয় বলের বাহক ডব্লিউ ও জেড বোসন।
মিউওন জি-২ পরীক্ষা
তবে এই আবিষ্কার কেবল ক্রেইকের পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ নয়। পঞ্চম বলের দিকে ইঙ্গিত করছে আরও কিছু পরীক্ষা। সবচেয়ে আলোচিত হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিল্যাবের মিউওন জি-২ পরীক্ষা। মিউওন হলো ইলেকট্রনের মতোই একটি কণা, কিন্তু তার ভর ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় দুইশো গুণ বেশি, এবং এটি অস্থায়ী—কিছুক্ষণ পরেই ভেঙে যায়। শক্তিশালী চুম্বক ক্ষেত্রে মিউওন একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে ঘুরতে থাকে এবং তার স্পিন বা ঘূর্ণন অক্ষ একটু একটু করে কাঁপতে থাকে, যাকে বলে প্রিসেশন বা উবল। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী এই কাঁপুনি কতটুকু হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে হিসেব করা যায়। কিন্তু ফার্মিল্যাবের পরীক্ষায় দেখা গেছে, মিউওনের কাঁপুনি হিসেবের চেয়ে বেশি। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো অজানা কিছু তাকে বাড়তি ধাক্কা দিচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এই গবেষণার দলটি ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ফান্ডামেন্টাল ফিজিকস পুরস্কার পেয়েছে।
দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পরীক্ষা, সম্পূর্ণ আলাদা পদ্ধতিতে, কিন্তু দুটোই ইঙ্গিত দিচ্ছে একই দিকে—প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের বাইরে কোনো কিছু আছে। এটা স্রেফ কাকতালীয় ব্যাপার নয় বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিপ্লবী সম্ভাবনা
তাহলে এর মানে কী দাঁড়ায়? যদি সত্যিই পঞ্চম বলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটা হবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি। স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে নতুন করে লিখতে হবে। গুপ্তবস্তু ও গুপ্তশক্তির রহস্য হয়তো উন্মোচিত হবে। মহাবিশ্বের গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে যাবে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলছেন এই পঞ্চম বল হয়তো গুপ্তবস্তু বা ডার্ক ম্যাটারের সাথে সংশ্লিষ্ট। আবার কেউ বলছেন, ওটা হয়তো মহাকর্ষের গভীর রহস্য বুঝতে সাহায্য করবে।
আরও পড়ুন: মহাকাশ স্টেশনে কি মহাকর্ষ বল শূন্য (২৫ ডিসেম্বর ২০২৫)। শক্তিশালী চুম্বক ক্ষেত্রে মিউওন একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে ঘুরতে থাকে এবং তার স্পিন বা ঘূর্ণন অক্ষ একটু একটু করে কাঁপতে থাকে, যাকে বলে প্রিসেশন বা উবল।
ডায়ানা ক্রেইক বলেছেন, ‘আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের মডেলে যে সমস্যা আছে, সেটা আমরা জানি। কারণ এমন অনেক কিছু আছে, যা সে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। কোথাও একটা ফাঁক আছে।’ স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতাই বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে চলে।
প্রতিষ্ঠার পথে চ্যালেঞ্জ
অবশ্য এখনই উৎসব করার সময় আসেনি। কোনো আবিষ্কার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে কিছুটা সময় লাগে। আগের ইতিহাসে দেখা গেছে, একটি আবিষ্কার তখনই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যখন বারবার, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্নভাবে একই ফলাফল পাওয়া যায়। ক্রেইকের দল এবং তাঁদের সহযোগী গবেষকরা এখনো রুলআউটের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। মানে প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে ফলাফলটা কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় কিনা, সেই সম্ভাবনাগুলো একে একে বাতিল করছেন। যত বেশি সম্ভাবনা বাতিল হবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে পঞ্চম বলের প্রমাণ।
কিন্তু এই সতর্কতার মধ্যেও একটি উত্তেজনা আছে। মানুষ হাজার বছর ধরে জানতে চেয়েছে মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে। নিউটন মহাকর্ষের সূত্র দিয়েছিলেন, আইনস্টাইন সেটাকে নতুনভাবে দেখিয়েছিলেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্স পরমাণুর জগতকে উন্মোচন করেছে। প্রতিটি বড় আবিষ্কার মানুষের জ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। পঞ্চম বল যদি সত্যিই আবিষ্কৃত হয়, সেটা হবে সেই ধারারই পরের অধ্যায়।
আর এই অধ্যায়ের শুরু হয়েছে একটি অতি পরিচিত উপাদান থেকে—ক্যালসিয়াম। যে খনিজটি দাঁত আর হাড় শক্ত রাখে, দুধে থাকে, পনিরে থাকে, প্রতিদিনের সাধারণ খাবারে থাকে—সেই ক্যালসিয়ামের পরমাণুর গভীরে হয়তো লুকিয়ে ছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যের সূত্র। বিজ্ঞান বারবার এভাবেই আমাদের চমকে দেয়—সবচেয়ে বড় সত্যগুলো প্রায়ই লুকিয়ে থাকে একদম সাধারণ জায়গায়।
সূত্র: সায়েন্স ইলাস্ট্রেটেড, উইকিপিডিয়া
আরও পড়ুন: মহাকর্ষ বল কীভাবে কাজ করে (১৬ জানুয়ারি ২০২৬)
পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন: পদার্থবিজ্ঞান, বিজ্ঞানচিন্তা



