মাস্ক-অল্টম্যানের লড়াই আদালতে: ওপেনএআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মামলা
মাস্ক-অল্টম্যানের লড়াই আদালতে: ওপেনএআইয়ের ভবিষ্যৎ

প্রযুক্তি দুনিয়ার দুই আলোচিত মুখ ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যান। ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যানের সঙ্গে ইলন মাস্কের পুরোনো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তাঁদের মধ্যকার তিক্ত বিরোধ অনলাইনে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও বিদ্রূপের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছিল। সম্প্রতি মাস্ক তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অল্টম্যানকে প্রতারক বলে কটাক্ষ করেছেন। তবে পরদিন থেকেই এই দুই প্রযুক্তি মহারথির লড়াই ভার্চুয়াল জগৎ ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে গড়ায়। এ ঘটনাই গেল কয়েক দিনের প্রযুক্তিবাজারের মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

আসলে যা হয়েছে

আদালতে ইলন মাস্ক দাবি করেন, অল্টম্যান লাখ লাখ ডলারের প্রতারণা করেছেন। তিনি চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের মূল লক্ষ্য অলাভজনক রাখার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। এ মামলায় মাস্ক ও অল্টম্যান দুজনেই সাক্ষ্য দেবেন বলে জানা গেছে। ২০১৫ সালে ইলন মাস্কসহ স্যাম অল্টম্যান, গ্রেগ ব্রকম্যান, ইলিয়া সুতস্কেভার, ওজচিয়াক জারেম্বা, দারিও আমোদেই প্রমুখ মিলে ওপেনএআই অলাভজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ মামলার রায়ের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করতে পারে। এই লড়াইকে অনেকে বক্সিং রিংয়ের দুই হেভিওয়েট যোদ্ধার লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সান ডিয়েগোর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সারাহ ফেডারম্যান একে কিং কং বনাম গডজিলার লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, মাস্ক ও অল্টম্যান অনেক প্রভাবশালী। তাঁরা সাধারণ মানুষের জীবন থেকে অনেক বিচ্ছিন্ন। তাঁদের সংঘাত দেখাটা অনেকটা রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্রের মতো। এ মামলার জন্য সোমবার ৯ সদস্যের একটি জুরিবোর্ড শপথ গ্রহণ করেছে। বিচারক ইভন গনজালেজ রজার্স এই বিচারপ্রক্রিয়া তদারক করছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মাস্ক বা অল্টম্যানের সম্পদ, ক্ষমতা বা তারকাখ্যাতির কারণে তাঁরা আদালতে কোনো বিশেষ সুবিধা পাবেন না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইলন মাস্কের মামলা

ইলন মাস্ক কেবল ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধেই মামলা করেননি, তিনি এর সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও মামলা করেছেন। মাস্কের দাবি, মাইক্রোসফট ওপেনএআইকে বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা করেছে। মাইক্রোসফট অবশ্য এ দাবি অস্বীকার করেছে। মাস্ক আদালতের কাছে কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন। মাস্ক ওপেনএআই অন্যায়ভাবে মুনাফা অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন। মাস্ক চান এই অর্থ ওপেনএআইয়ের অলাভজনক শাখায় ব্যবহার করা হোক। এ ছাড়া তিনি অল্টম্যানকে কোম্পানি থেকে অপসারণসহ বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঈর্ষার উপস্থিতি

পাল্টা যুক্তিতে ওপেনএআই বলছে, ইলন মাস্ক মূলত ঈর্ষা এবং কোম্পানি ছেড়ে দেওয়ার অনুশোচনা থেকে এই মামলা করেছেন। যখন আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স তৈরির দৌড় তুঙ্গে, তখন ইলন মাস্ক তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে লাইনচ্যুত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিরোধের সূত্রপাত

২০১৫ সালে ইলন মাস্ক, স্যাম অল্টম্যান ও অন্যরা ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। তাদের লক্ষ্য ছিল এআই যাতে সমগ্র মানবতার উপকারে আসে, তা নিশ্চিত করা। তখন ইলন মাস্কের তারকাখ্যাতি ছিল তুঙ্গে। টেসলা আর স্পেসএক্সের মাধ্যমে তিনি প্রযুক্তিবিশ্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছিলেন। অন্যদিকে স্যাম অল্টম্যান সিলিকন ভ্যালিতে পরিচিত থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে ততটা পরিচিত ছিলেন না। ২০১২ সালে একজন বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় হয়। অল্টম্যান তখন মাস্কের কাছে ওপেনএআইয়ের ধারণাটি তুলে ধরেন। শুরুতে তাঁরা দুজনেই এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। ২০১৫ সালের একটি যৌথ সম্মেলনে মাস্ক বলেছিলেন, এআই এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানবতাকে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন করতে পারে, তবে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ইলন মাস্কের দাবি অনুযায়ী, ওপেনএআই একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরু হয়েছিল, সেটি পরবর্তী সময়ে অবৈধভাবে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের দাবি, ২০১৭ সালে মাস্ক নিজেই একমত হয়েছিলেন। তখন মূল লক্ষ্য অর্জনে বাণিজ্যিক পথে হাঁটা যৌক্তিক মনে করেছিলেন ইলন মাস্ক। তখন নাকি ইলন মাস্ক নিজেই কোম্পানির সিইও হতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছিলেন বলে সব প্রত্যাখ্যান করা হয়। ক্ষমতার সেই লড়াইয়ের জেরে ২০১৮ সালে মাস্ক ওপেনএআই ছেড়ে চলে যান। যাওয়ার আগে এক ই-মেইলে তিনি লিখেছিলেন, ‘বন্ধুরা, অনেক হয়েছে। হয় তোমরা নিজেরা কিছু করো অথবা ওপেনএআইকে অলাভজনক হিসেবেই চালিয়ে যাও। আমি আর কোনো অর্থ দেব না।’

২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি মুক্তির পর ওপেনএআই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটিতে পৌঁছায়। এরপর মাস্ক তাঁর নিজস্ব এআই স্টার্টআপ এক্সএআই শুরু করেন। এক্সএআই বর্তমানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।

লড়াইয়ের পেছনে যা চলছে

মাস্ক দাবি করেছেন, তিনি ওপেনএআইতে প্রায় চার কোটি মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। সম্প্রতি এক বিনিয়োগ রাউন্ডে ওপেনএআইয়ের মূল্য ধরা হয়েছিল ১৫৭ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে শোনা যাচ্ছে এর আইপিও বা শেয়ারবাজারে আসার প্রস্তুতি চলছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮৫০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। গত বছর ইলন মাস্ক এবং একদল বিনিয়োগকারী ৯৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে ওপেনএআইয়ের সম্পদ কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা স্যাম অল্টম্যান প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি অল্টম্যান ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, মাস্ক চাইলে তাঁরা ৯ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে মাস্কের সোশ্যাল মিডিয়া এক্স কিনে নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ল স্কুলের অধ্যাপক ডরোথি লুন্ড বলেন, মাস্ক একাধিকবার ওপেনএআই দখল করার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। তাই তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

এ মামলায় মাইক্রোসফটের প্রধান সত্য নাদেলা, ওপেনএআইয়ের সাবেক বিজ্ঞানী মীরা মুরাতি ও ইলিয়া সুতস্কেভার আর পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য শিবন জিলিস সাক্ষ্য দেবেন। শিবন জিলিস মাস্কের চারটি সন্তানের মা। বিচার চলাকালীন ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক তথ্যও উঠে আসতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।

এ মামলার ফলাফল ইলন মাস্ক ও ওপেনএআই সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোজ চ্যান লুই বলেন, যদি ইলন মাস্ক এ মামলায় জেতেন, তবে এজিআই তৈরির দৌড়ে তিনি তাঁর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করবেন। যে এই দৌড়ে জিতবে, তাঁর হাতেই থাকবে আগামীর ক্ষমতা। ইলন মাস্ক নিজেকে অলাভজনক স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করলেও তিনি নিজেই একটি বড় এআই কোম্পানি চালাচ্ছেন, যা তাঁকে এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ প্রমাণ করা কঠিন করে তুলবে। অধ্যাপক ফেডারম্যানের মতে, দিনশেষে একজন জয়ী হবে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের এ লড়াই যে পথ তৈরি করবে, আমাদের সবাইকে সেই পথেই চলতে হবে।