সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া ডিজিটাল আইনগুলো মানুষের মত প্রকাশ ও ব্যক্তি-গোপনীয়তার জন্য এখনও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিজিটাল রাইটস এশিয়া-প্যাসিফিক বাংলাদেশ জাতীয় সম্মেলন ২০২৬-এ বক্তারা বলেন, অংশীজনদের মতামত ছাড়াই আইনগুলো দ্রুত পাস করা হয়েছে এবং ব্যাপক ডিজিটাল নজরদারির সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইন পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নতুন আইনগুলোতে নানা অসংগতি রয়েছে এবং সেগুলো জুলাইয়ের চেতনা ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পুরোনো আইনগুলো নতুন নামে আনা হয়েছে, যা মানুষের ক্ষমতায়নে সহায়ক নয়। তিনি আরও বলেন, সংসদের নেতারা অতীতে এমন আইনের অপব্যবহারের শিকার হয়েও একই ধরনের আইন প্রণয়ন করেছেন।
গণ-নজরদারির ঝুঁকি
অধিবেশনে পাস হওয়া আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক গণ-নজরদারির কাঠামো তৈরি করতে পারে বলে উদ্বেগ জানান বক্তারা। ডেইলি স্টারের জয়েন্ট এডিটর আশা মেহরীন আমিন বলেন, ফেসবুক পোস্টের কারণে আগের মতোই মামলা হচ্ছে এবং সাংবাদিকরা এখনও নজরদারির ঝুঁকিতে আছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই আইন তৈরি করে এবং নতুন সরকার তা কিছুটা সংশোধন করে তড়িঘড়ি পাস করে। ফলে আগের অধ্যাদেশের দুর্বলতা রয়ে গেছে এবং সরকারের জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন বক্তারা।
আইন যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে ইউনেস্কোর হেড অব রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ বলেন, প্রতিটি আইনকে সমাজের নিরিখে যাচাই করা প্রয়োজন। নতুন সরকার আইনগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে মানবাধিকার রক্ষার সুযোগ কাজে লাগাক।
সরকারের অবস্থান
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, আইনগুলো দরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও সমস্যা থাকলে পরে সংশোধন করা যাবে এবং সরকার ইতোমধ্যে সেগুলো উন্নত করার জন্য কাজ করছে।
দ্বিতীয় সেশন: প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মতামত
দ্বিতীয় সেশনে মেটার পাবলিক পলিসি ম্যানেজার রুজান সারওয়ার বলেন, উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন নিয়ে চার বছর ধরে লড়াই চলেছে। ডেটা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণের বিধানের কারণে মেটার উপস্থিতি রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে ভাবা হয়েছে। তবে সংসদে পাস হওয়া উপাত্ত সুরক্ষা আইন মেটা ও গুগলের মতো প্লাটফর্মগুলোর জন্য ভালো। ফেসবুকে উসকানি দিয়ে গণমাধ্যমে হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে উন্নতি করতে হবে, তবে উসকানি এক প্লাটফর্ম থেকে অন্য প্লাটফর্মে গেলে কিছু করার থাকে না। ভবিষ্যতে স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হবে।
টেলিনর এশিয়ার মতামত
টেলিনর এশিয়ার হেড অব পাবলিক অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স প্রত্যুষ রাও বলেন, টেলিযোগাযোগ সংশোধন আইনের ৯৭ (ক) ধারা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন এনটিএমসি বাদ দিয়ে নতুন সংস্থা হয়েছে। তারা দেখতে চান ম্যান্ডেট কীভাবে কাজ করবে এবং কার কর্তৃত্ব থাকবে।
বিটিআরসির বক্তব্য
বিটিআরসির কমিশনার মাহমুদ হোসাইন বলেন, অনেক সময় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে আইন বদলে যায়। কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছাতে পারে, অন্যরা পারে না, ফলে আস্থার অভাব তৈরি হয়। তবে বিটিআরসি সবার সঙ্গে কথা বলে নীতি প্রণয়নের চেষ্টা করে।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কণ্ঠ
শেয়ারট্রিপের প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া হক বলেন, নীতি আলোচনায় স্থানীয় উদ্যোক্তারা তেমন ভূমিকা রাখতে পারেন না। আইনের প্রভাব সম্পর্কে জানার ঘাটতি এবং সরকারের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ না থাকায় ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠ হারিয়ে যায়।
তৃতীয় সেশন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ডিনেটের আয়োজনে তৃতীয় প্যানেল আলোচনায় নির্বাহী চেয়ার ড. অনন্য রায়হান ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন। তারা এআই নীতিমালা প্রণয়নে অর্থবহ আলোচনার তাগিদ দেন। শেষ অধিবেশনে ডিজিটালি রাইটের নবীন টেক পলিসি ফেলোরা তাদের গবেষণা তুলে ধরেন।
সমাপনী বক্তব্য
ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এককভাবে সরকার বা বেসরকারি কোম্পানির বিষয় নয়। এতে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সব অংশীজনদের মতের প্রতিফলন থাকতে হবে। তিনি জানান, এই সম্মেলন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার একটি ক্ষেত্র এবং তারা ভবিষ্যতেও এটি অব্যাহত রাখবেন।



