স্যাম অল্টম্যানের জন্মদিন: এআই জগতের এক অনন্য বিপ্লবী
আজ ২২ এপ্রিল, আধুনিক প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং চ্যাটজিপিটির অন্যতম উদ্ভাবক স্যাম অল্টম্যানের জন্মদিন। বর্তমানে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা স্যাম অল্টম্যান ১৯৮৫ সালের এই দিনে শিকাগোতে জন্ম নেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে তাঁর ভূমিকা মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আর তাই অল্টম্যানকে বর্তমানে তুলনা করা হয় স্টিভ জবস বা বিল গেটসের মতো দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টাদের সঙ্গে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন: কম্পিউটিংয়ের প্রতি সহজাত আকর্ষণ
শিকাগোতে ১৯৮৫ সালে জন্ম হলেও অল্টম্যান বেড়ে ওঠেন মিসৌরির সেন্ট লুইস শহরে। ছোটবেলা থেকেই সংখ্যা এবং কম্পিউটিংয়ের প্রতি তাঁর ছিল সহজাত ঝোঁক। মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি ম্যাকিনটোশ কম্পিউটারে কোড লিখতে শিখেছিলেন। কৈশোরেই নিজের স্বকীয়তা সম্পর্কে সচেতন অল্টম্যান সব সময়ই ছিলেন নির্ভীক। অল্টম্যান স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটারবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও দুই বছর পর তা ছেড়ে দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শ্রেণিকক্ষে প্রথাগত পড়ালেখার চেয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে পোকার খেলা তিনি বেশি শিখেছেন। তাঁর মতে, পোকার তাঁকে শিখিয়েছে—কীভাবে মানুষের আচরণের ধরন বুঝতে হয় এবং অপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
প্রারম্ভিক ক্যারিয়ার: লুপ্ট থেকে ওয়াই কম্বিনেটর
২০০৫ সালে অল্টম্যান গড়ে তোলেন লুপ্ট নামের অ্যাপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এটি ছিল স্টার্টআপ অ্যাক্সিলারেটর ওয়াই কম্বিনেটর থেকে ফান্ড পাওয়া প্রথম প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। যদিও লুপ্ট বড় ধরনের ব্যবসায়িক সফলতা পায়নি, কিন্তু অল্টম্যানের সাংগঠনিক দক্ষতা নজরে আসে ওয়াই কম্বিনেটরের প্রতিষ্ঠাতা পল গ্রাহামের। ২০১৪ সালে অল্টম্যান এ প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ওয়াই কম্বিনেটর বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্টার্টআপ ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়। এয়ারবিএনবি, ড্রপবক্স, রেডিট ও ইনস্টাকার্টের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টগুলো তাঁর হাত ধরেই বড় হয়েছে। অল্টম্যান শিখিয়েছেন, কীভাবে একটি সাধারণ আইডিয়াকে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় রূপান্তর করতে হয়।
ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগের সূচনা
২০১৫ সালে স্যাম অল্টম্যান, ইলন মাস্কসহ আরও কয়েকজন মিলে গড়ে তোলেন ওপেনএআই। লক্ষ্য ছিল এমন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা, যা সমগ্র মানবজাতির উপকারে আসবে। অল্টম্যান ওপেনএআইয়ের গুরুত্বকে তুলনা করেন পারমাণবিক বোমা তৈরির ম্যানহাটান প্রজেক্টের সঙ্গে। তিনি বিশ্বাস করেন, আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই একদিন মানুষের মতো সব কাজ করতে সক্ষম হবে। একে তিনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি বলে মনে করেন।
ব্যবসায়িক কৌশল: মাইক্রোসফটের অংশীদারত্ব ও চ্যাটজিপিটির উত্থান
২০১৯ সালে অর্থের সংকট কাটাতে স্যাম অল্টম্যান ওপেনএআইকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে লিমিটেড প্রফিট মডেলে নিয়ে আসেন। মাইক্রোসফটের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলেন। এই কৌশলী সিদ্ধান্তের ফলেই জিপিটি আর্কিটেকচারের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ২০২২ সালের শেষের দিকে চ্যাটজিপিটি চালুর মাধ্যমে অল্টম্যান সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এআই পৌঁছে দেন। মানুষের কাজ করার ধরন বদলে দেওয়ার এক হাতিয়ার এখন চ্যাটজিপিটি।
ক্যারিয়ারের বড় ধাক্কা: পদচ্যুতি ও প্রত্যাবর্তন
২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর অল্টম্যানের ক্যারিয়ারে আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ওপেনএআইয়ের পরিচালনা বোর্ড হঠাৎ করে তাঁকে সিইও পদ থেকে বরখাস্ত করে। অভিযোগ ছিল, তিনি বোর্ডের কাছে স্বচ্ছ ছিলেন না। এই খবর পুরো সিলিকন ভ্যালিতে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ওপেনএআইয়ের প্রায় সব কর্মী পদত্যাগের হুমকি দিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় অল্টম্যান বীরদর্পে নিজের পদে ফিরে আসেন এবং বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়।
স্যাম অল্টম্যানের জীবন ও কর্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে। তাঁর জন্মদিনে আমরা স্মরণ করছি এই দূরদর্শী নেতাকে, যিনি প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাচ্ছেন।



