মানুষের সব কাজ হয়তো এআই দখল করতে পারবে না। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে। তেলের দাম, গ্যাসের দাম, সিলিন্ডার আর বিদ্যুতের বিল—সব মিলিয়ে ব্যবসার ওপর প্রচণ্ড চাপ এই মুহূর্তে। এই অবস্থায় টিকে থাকতে হলে অপারেটিং খরচ কমাতেই হবে। কারণ, দাম বাড়ালেই বাজার হাত থেকে চলে যাবে। তাই ব্যবসাগুলো এখন মরিয়া হয়ে প্রযুক্তি আর অটোমেশনের দিকে ঝুঁকছে। গত এক বছরে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই একটা জিনিস নিয়েই আমার সঙ্গে কথা বলেছেন।
টেক ইন্ডাস্ট্রিগুলোও অনেকটা বাধ্য হয়েই এআই ব্যবহার ও প্রয়োগের দিকে পা বাড়াচ্ছে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন—না চাইলেও কোনো উপায় নেই। তবে এআই এখনো হাতের মুঠোয় প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে মোডে আসেনি। তাই নতুন এই প্রযুক্তি নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অনেক ব্যবসা প্রচুর টাকা নষ্ট করবে। এটাই স্বাভাবিক। নতুন প্রযুক্তির শুরুটা সব সময় একটু অপ্রত্যাশিত হয়। টাকা হারিয়ে মানুষ শেখেন। সেভাবে সামনের কয়েক বছরে ব্যবসাগুলো এআই ইন্টিগ্রেশনেও প্রচুর পয়সা নষ্ট করবে। এটা আমার অনুমান না, তথ্য বলছে। এমআইটির ২০২৫ সালের একটা গবেষণায় দেখা গেছে ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরেও ৯৫ শতাংশ এন্টারপ্রাইজ এআই প্রজেক্ট থেকে কোনো মাপযোগ্য রিটার্ন আসেনি। মাত্র ৫ শতাংশ পাইলট প্রোডাকশনে গেছে।
কারণটা কী
অনেকে মনে করেন, মডেল খারাপ বলে প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়। আসল চিত্রটা উল্টো। ১৪০টা এন্টারপ্রাইজ এআই বাস্তবায়ন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র ২৩ শতাংশ ব্যর্থতা হয় মডেল পারফরম্যান্স বা তথ্যের মানের কারণে। বাকি ৭৭ শতাংশ ব্যর্থ হয় কৌশল, শাসন এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার কারণে। মানে প্রযুক্তি ঠিকই আছে। কিন্তু কোথায় লাগাব, কীভাবে লাগাব, কোন প্রক্রিয়ার কোন ধাপে লাগাব—এই বোঝাপড়ার অভাবেই কোটি টাকা নষ্ট হচ্ছে।
একটা উদাহরণ দিই। একটা যোগাযোগ কেন্দ্রে সারসংক্ষেপ ইঞ্জিন বানানো হলো, ৯০ শতাংশ নির্ভুলতা। কিন্তু তত্ত্বাবধায়করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি নোটে ভরসা পাননি। এজেন্টদের আগের মতোই ম্যানুয়ালি টাইপ করতে বললেন। পুরো সিস্টেম বিপদে পড়ে গেল। প্রজেক্ট ব্যর্থ, টাকাও গেল।
ডেলোয়েটের ২০২৬ সালের ‘স্টেট অব এআই’ প্রতিবেদনে ৩ হাজার ২০০-এরও বেশি ব্যবসা নেতার জরিপে দেখা গেছে মাত্র ২৫ শতাংশ কোম্পানি তাদের ৪০ শতাংশ বা তার বেশি এআই পরীক্ষা প্রোডাকশনে নিয়ে যেতে পেরেছে। বাকিগুলো পাইলটেই আটকে আছে। এ সমস্যার একটা নাম আছে ‘পাইলট ক্লান্তি’। একটার পর একটা পাইলট করা হচ্ছে, কিন্তু স্কেল আপ হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে একজন স্বাস্থ্যসেবা এআই নেতা বলেছেন, কোম্পানিতে কোনো সুসংহত এআই কৌশল না থাকলে পাইলট ক্লান্তি দেখা দেয়। পরিকল্পনা ছাড়া একশটা পাইলট করলেও ফল শূন্য। ব্যর্থতার দ্বিতীয় বড় কারণ হলো এআই সিস্টেম ডিজাইন আর আসল ব্যবসা প্রক্রিয়ার মধ্যে অমিল। এটা ৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে। অর্থাৎ টুল বানানো হয়েছে, কিন্তু সেই টুল ব্যবসার পাইপলাইনে কোথায় বসবে, সেটা কেউ ঠিকমতো ভাবেনি।
ডেলোয়েট বলছে, ৮৪ শতাংশ কোম্পানি এখনো তাদের চাকরি বা কাজের ধারা এআইকে মাথায় রেখে পুনর্নির্মাণ করেনি। শুধু কর্মীদের এআই টুল ব্যবহার শেখানো হচ্ছে। কিন্তু কাজের ধরনটাই বদলে দেওয়ার কথা কেউ ভাবছে না। আরেকটা নতুন সমস্যা উঠে আসছে, এজেন্টিক এআই। ৭৪ শতাংশ কোম্পানি দুই বছরের মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্ট মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু মাত্র ২১ শতাংশ কোম্পানির কাছে এই এজেন্টগুলোর শাসনের জন্য পরিপক্ক কোনো মডেল আছে। মানে গাড়ি চালু করে দিয়েছি, কিন্তু ব্রেক ঠিকমতো তৈরি হয়নি। গার্টনারের পূর্বাভাস হলো, ২০২৭ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ এজেন্টিক এআই প্রজেক্ট বাতিল হবে—অতিরিক্ত খরচ, স্পষ্ট ব্যবসা মূল্য না থাকা আর দুর্বল ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কারণে।
তাহলে এই পরিস্থিতিতে কোন ধরনের কোম্পানির সুযোগ আছে?
যে কোম্পানি দুটি জিনিস একসঙ্গে বোঝে—এআই আর ডোমেইন। শুধু এআই জানলে হবে না, ব্যবসা প্রক্রিয়ার ভেতরের খেলাটাও বুঝতে হবে। একটা উৎপাদন কোম্পানির সংগ্রহ পাইপলাইনে এআই ঢোকাতে গেলে শুধু মডেল চেনা দিয়ে হবে না। সেই কোম্পানির প্রতিটা অনুমোদন ধাপ, বাধা, তথ্য প্রবাহ বুঝতে হবে।
ডেলোয়েট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যে কোম্পানিগুলো সত্যিকারের রূপান্তর গেছে, তারা এআইকে শুধু দক্ষতা টুল হিসেবে ব্যবহার করেনি। তারা মূল পণ্য আর ব্যবসা মডেলটাই বদলে নিয়েছে। এই গ্রুপটা মাত্র ৩৪ শতাংশ। সফল বাস্তবায়নগুলো একটার পর একটা কাজ করে। শুরুতে ছোট, সুনির্দিষ্ট একটা সমস্যা বেছে নেয়। ‘মাপযোগ্য’ ফলাফল ঠিক করে। সেখানে সাফল্য পেলে ধীরে ধীরে বাড়ায়। যারা প্রথম দিন থেকেই পুরো এন্টারপ্রাইজ রূপান্তর করতে নামে, তারাই বেশি বিপদে পড়ে।
সুযোগটা বিশাল। কিন্তু সেই সুযোগ ধরতে পারবে সে, যে ডোমেইন জ্ঞান দিয়ে বলতে পারবে কোথায় এআই লাগবে, কোথায় লাগবে না, আর কোথায় লাগালে আসলেই কাজের কাজ হবে। আর সে কারণে আসছে ‘ডেপ্লয়কো’ নামের নতুন ধরনের কোম্পানি, যাদের দক্ষতা হচ্ছে কোম্পানিগুলোতে এআই সংযুক্ত করা। তৈরি হচ্ছে অনেক ফরওয়ার্ড মোতায়েন প্রকৌশলী।
রকিবুল হাসান টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক



