সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তার: রাজনীতি ও এআই-নির্মিত কনটেন্টে বিভ্রান্তি
গত সপ্তাহে দেশের তথ্য যাচাইকারী চারটি প্রতিষ্ঠান মোট ১০১টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৬টি প্রতিবেদন, সরাসরি রাজনীতিকেন্দ্রিক বিষয় নিয়ে তৈরি। অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক শীর্ষস্থানে রয়েছে, এরপরেই টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের অবস্থান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি ছবি ও ভিডিওও উল্লেখযোগ্য হারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, যেমন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলনে অনশনরত অবস্থায় গোপনে ফলের রস পান কিংবা কৃষক কার্ডপ্রাপ্ত কবির হোসেনের বিলাসী জীবনযাপনের ছবি এআই দিয়ে নির্মিত বলে প্রমাণিত হয়েছে।
রাজনৈতিক অপতথ্যের বিস্তার
১১ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত রিউমার স্ক্যানার, ফ্যাক্ট চেক, ডিসমিসল্যাব ও দ্য ডিসেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওয়েবসাইটে যথাক্রমে ৭১, ৭, ১১ ও ১২টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রাজনৈতিক দল যেমন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভুয়া তথ্য পাওয়া গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফেসবুকে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সপরিবার দুবাইয়ে কেক কাটার পুরোনো ছবি ও গাড়িতে চলাচলের ভিডিও ব্যবহার করে 'নেতা বিদেশে বিরিয়ানি খায়, কর্মী দেশে প্যাদানি খায়' দাবি করা হয়েছিল, যা যাচাইয়ে মিথ্যা প্রমাণিত।
এছাড়াও, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের নামে 'আমি যদি এখনো ডাক দেই দেশের ৮০ ভাগ মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে' শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়, যা একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে উদ্ভূত। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী নির্যাতন বা তাদের কর্মসূচি দাবি করে পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়ানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অপতথ্য
আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১৭টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে বেশি অপতথ্য ছড়িয়েছে। ফেসবুকে একটি ভিডিওতে আজান চলাকালীন মসজিদে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার দৃশ্য দেখিয়ে ইসরায়েলের হামলা দাবি করা হয়েছিল, কিন্তু যাচাইয়ে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং এটি ইরান-ইসরায়েল সংঘাতেরও অংশ নয়। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ শপথ নেওয়ার পর সব প্রাইভেট স্কুল বন্ধ করার আদেশ দিয়েছেন বলে ফেসবুকে দাবি করা হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
খেলাধুলার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ক্রিকেট নিয়ে ভুল তথ্যগুলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন কমিটি গঠনকেন্দ্রিক ছিল। ৭ এপ্রিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) তামিম ইকবালকে সভাপতি করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করলেও, একাধিক ভুয়া তথ্য ছড়ায়, যেমন বিসিবি থেকে পদচ্যুত এমিনুল ইসলাম বুলবুলের এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলে নিয়োগ বা তামিম ইকবালের ভারতের সাথে সম্পর্ক ঠিক করার মিথ্যা উক্তি। কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের নামে একটি ফটোকার্ডও প্রচারিত হয়েছিল, যার কোনো সত্যতা নেই।
এআই-নির্মিত কনটেন্টের প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-নির্ভর ভুয়া তথ্য মানুষকে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্ত করছে। গত সপ্তাহে শনাক্ত ১৯টি অপতথ্য এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিও ছিল, যা ব্যবহারকারীরা আসল ভেবে ছড়িয়েছে। কবির হোসেনের বিলাসী জীবনযাপনের ছবি এআই দিয়ে তৈরি এবং তিনি নিজেই তা পোস্ট করেছিলেন, পরে যা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। এনসিপির সারজিস আলমের বাবাকে নিয়ে ভারতে চিকিৎসার ছবিও এআই নির্মিত বলে প্রমাণিত।
ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে অপতথ্যের বিস্তার
গত এক সপ্তাহে শনাক্ত অপতথ্যের ৮৩টি ফেসবুকে পাওয়া গেছে, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের পর ইউটিউব, এক্স ও থ্রেডসেও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভুয়া তথ্য ছড়ানোর কৌশলগুলোর মধ্যে পুরোনো ছবি ও ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা, ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন, অপহরণ বা নির্যাতনের পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনা বলে প্রচার, এবং সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে ভুয়া বক্তব্য ছড়ানো অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছিল।



