চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সন্তোষপুর ইউনিয়নের উত্তর সন্তোষপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে চোখে পড়ে একতলা একটি পাকা দালান। ভবনের দুই পাশের সানশেডে দেওয়া হয়েছে সুদৃশ্য টাইলস। বাড়ির নির্মাণশৈলীতে আছে শৌখিনতার ছাপ। এর আশপাশে আরও কয়েকটি পাকা বাড়ি দেখা গেল। সেসবও সম্প্রতি তৈরি। একসময় সন্তোষপুরের এই জায়গায় টিনের আধা পাকা বাড়ির সংখ্যাই বেশি ছিল। বাসিন্দাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষিকাজ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কাঁচা বাড়ির অনেকগুলোই পাকা হয়েছে। বাজারে দোকানপাটের সংখ্যাও বেড়েছে। এই পরিবর্তনের কারণ প্রবাসী আয়। উত্তর সন্তোষপুর গ্রামের অনেক পরিবারেই দু-একজন সদস্য বিদেশে থাকেন। প্রবাসীদের শ্রমে-ঘামে বদলে যাচ্ছে গ্রামটি।
সমন্বিত কৃষি খামার ও প্রবাসী উদ্যোক্তা
গ্রামের সারি সারি ধানখেতের এক পাশে চোখে পড়ে বেশ গোছানো আধুনিক একটি কৃষি খামার। খামারে ধান, হাঁস, গরু, মাছ ও সবজি চাষ হয় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। আটজন শ্রমিক কাজ করেন খামারটিতে। কৃষি খামারের মালিক মনিরুজ্জামান একসময় আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষকের কাজ করতেন। তাঁর উপার্জনে গ্রামে পাকা দালান হয়েছে। দেশে ফিরে গড়েছেন 'সতেজ কৃষি খামার' নামের এই সমন্বিত বাণিজ্যিক খামারটি।
প্রবাসী পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
ওই এলাকায় একতলা একটি পাকা বাড়ি করেছেন আরিফুল ইসলাম নামের সৌদি আরবপ্রবাসী এক ব্যক্তি। তাঁর ষাটোর্ধ্ব বাবা মো. ছুফিয়ান বলেন, তিনি নিজেও ভাগ্য ফেরাতে ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি। এখন তাঁর দুই ছেলে বিদেশে গেছেন। এক ছেলে বাড়িও করেছেন। এখন আর তাঁকে কষ্ট করে টিনের ঘরে থাকতে হয় না।
সন্তোষপুর ইউনিয়নে বহু প্রবাসী থাকলেও সঠিক সংখ্যা জানা নেই কারও। তবে জানা গেছে একটি ওয়ার্ডের হিসাব। ইউপি সদস্য মো. আশরাফ জানান, সন্তোষপুরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ২৫০টি পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের অন্তত ৩০০ সদস্য প্রবাসে রয়েছেন। তিনি বলেন, এলাকাটি গত কয়েক দশকে চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে। পাকা বাড়ি হচ্ছে। বাজারে দোকানের সংখ্যা বাড়ছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির চালচিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
প্রবাসী আয়ের বিশাল অবদান
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও ২০২৫ সালে সন্দ্বীপে আয়োজিত একটি সভায় উল্লেখ করেছিলেন যে সন্দ্বীপের প্রবাসীরা প্রায় দেশের মোট প্রবাসী আয়ের ১৩ শতাংশের জোগান দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, 'এমন একটা কথা বিভিন্ন সময়ে শুনে এসেছি। কিন্তু এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য-উপাত্ত পাইনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাকে তথ্যটি জানিয়েছিলেন। উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সন্দ্বীপবাসীর পাঠানো প্রবাসী আয়ের হার হবে অতি উচ্চ।'
কেবল উত্তর সন্তোষপুর গ্রাম নয়, সন্দ্বীপজুড়ে এমন পরিবর্তন চোখে পড়ে। দ্বীপ উপজেলাটির অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বড় ভূমিকা রাখছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সন্দ্বীপের ২ হাজার ৮০ জন বিদেশে গেছেন। উপজেলার প্রবাসীরা সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া প্রবাসীর সংখ্যা বেশি।
রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জিও বিষয়টির সঙ্গে একমত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে প্রবাসী আয়ের তালিকায় সন্দ্বীপ উপজেলা ওপরের দিকে থাকবে। এখানকার মানুষ কত ভাগ রেমিট্যান্সের জোগান দেন, আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান দিয়ে তা নির্ধারিত নয়। তবে সন্দ্বীপের প্রবাসীরা দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জোগানদাতা, এমন দাবি যুক্তিযুক্ত।
একাধিক প্রবাসী সদস্যের পরিবার
সন্দ্বীপে এমন অনেক পরিবার আছে, যেখানে একাধিক বাসিন্দা প্রবাসী। উপজেলার হারামিয়া এলাকার এস এম আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তাঁর পরিবার ও স্বজন মিলে তাঁদের বাড়ির অন্তত ৬৩ জন রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কাতারে।
দর্শনীয় বাড়ি ও ব্যবসায়িক প্রসার
মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের দোতলা বাড়িটি দেখলে ঢাকা–চট্টগ্রামের যেকোনো অভিজাতপাড়ার বাড়ির কথা মনে পড়ে যাবে। নকশাদার স্তম্ভ আর ঝুলবারান্দার বাড়িটি দূর থেকেই নজর কাড়ে পথচারীদের। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইপ্রবাসী শাহাদাত হোসেন বাড়িটি করেছেন। মাইটভাঙ্গায় এমন বাড়ি আরও রয়েছে। প্রশস্ত আঙিনা আর গাছপালাঘেরা বাড়িগুলোর বেশির ভাগেরই মালিক প্রবাসী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীও রয়েছেন।
মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের বড় বাজার পোলিশ্যা বাজারের ব্যবসায়ী জিয়াউল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, এলাকায় অনেক প্রবাসী বাড়ি করেছেন। নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটা পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন খাবারের দোকান, পোশাক ও নিত্যপণ্যের দোকান গড়ে উঠেছে। একশ্রেণির মানুষ ভালো ব্যবসা করছেন।
মাইটভাঙ্গার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে থাকেন তরুণ ব্যবসায়ী শফিউল আযম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীর বাড়ির সদস্য, তাঁর ভাষায় আমেরিকায় যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন বলে জানালেন। শফিউল প্রথম আলোকে বলেন, 'আমার দুই ভাইসহ পরিবারের সাত সদস্য আমেরিকায় আছেন। দেশে আপাতত ব্যবসা করছি। কিন্তু কাগজপত্র তৈরি হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে আমিও আমেরিকায় পাড়ি জমাব।'
বাজারে প্রবাসী পরিবারের প্রভাব
উত্তর সন্দ্বীপের সবচেয়ে বড় বাজার আকবরহাট। এখানকার কাঁচা তরকারি বিক্রেতা, মুদিদোকানি এবং পোশাকের দোকানের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের ক্রেতাদের প্রায় ৮০ ভাগই প্রবাসী পরিবারের। এখানকার 'স্টাইল অ্যাভিনিউ' নামের একটি পোশাকের দোকানে সব সময় ভিড় লেগে থাকে। দোকানটির স্বত্বাধিকারী মাহমুদুল হাসান বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ভালো ব্র্যান্ডের পোশাক সংগ্রহ করেন তিনি। তাঁর দোকানে ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে শার্ট ও প্যান্ট রয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা দামের শাড়িও রয়েছে। এসব পণ্যের বেশির ভাগ ক্রেতাই প্রবাসীদের পরিবার বলে জানান তিনি।
আকবরহাটের অদূরে মুন্সীরহাট এলাকার বিকাশ এজেন্ট আমিনুর রসুলকে ব্যস্ত থাকতে হয় গ্রাহকদের চাপে। বেশির ভাগ গ্রাহক ক্যাশ আউট করেন। তিনি বলেন, তাঁর দোকানে ক্যাশ আউট করতে আসা বেশির ভাগই প্রবাসী পরিবারের। ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় এলেও অনেক প্রবাসীর পরিবার চট্টগ্রামে থাকে। সেখানে টাকা তুলে গ্রামের আত্মীয়স্বজনের কাছে বিকাশে টাকা পাঠান তাঁরা।
স্থানীয় ব্যাংকের শাখাগুলোতে মোট লেনদেনের একটা বড় অংশ প্রবাসীদের বলে জানান ব্যাংক কর্মকর্তারা। স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক পিএলসির সন্দ্বীপ শাখার ব্যবস্থাপক পারভেজ-উর-রহমান বলেন, ব্যাংকের মোট লেনদেনের ৬০ শতাংশের মতো প্রবাসীরাই করে থাকেন।
বিদেশগমনের ঐতিহ্য
সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেক পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই জাহাজে চাকরির সুবাদে সন্দ্বীপের লোকজন বিদেশে পাড়ি জমানো শুরু করেন। পরে গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে বিদেশে যাওয়ার হার বাড়তে থাকে।
বেলাল মোহাম্মদ ও আবুল কাশেম সন্দ্বীপ সম্পাদিত 'সন্দ্বীপ সন্দর্শন' এবং রাজীব হুমায়ুন সম্পাদিত 'সন্দ্বীপের ইতিহাস' বইয়ে এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজে নাবিক বা 'লস্কর'–এর পেশা বেছে নিয়েছিলেন সন্দ্বীপের বেশ কিছু মানুষ। তাঁরাই প্রথম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এরপর তাঁদের হাত ধরে সেসব দেশে সন্দ্বীপ প্রবাসীদের একটা প্রজন্ম গড়ে ওঠে। আবার গত শতকের আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাড়ি জমাতে শুরু করেন অনেকে। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দেখে পরবর্তী সময়ে বড় একটি জনগোষ্ঠী বিদেশে যেতে উদ্বুদ্ধ হয়।
প্রতারণার ফাঁদ ও চ্যালেঞ্জ
বিদেশি শ্রমবাজারে দক্ষতার অভাব আর প্রতারকের খপ্পরে পড়ে সন্দ্বীপের অনেকেই নিঃস্ব হচ্ছেন। সন্তোষপুরের আরিফ হোসেন এর বড় উদাহরণ। সৌদি আরবে গিয়ে প্রতারিত হয়ে মাত্র ২৭ দিনেই দেশে ফিরতে হয়েছে তাঁকে। আরিফ বলেন, 'উপার্জনের আশায় নিজের ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানটি বিক্রি করে ভিসা নিয়েছিলাম। এখন আমার আর কোনো সম্বল নেই।'
প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের সন্দ্বীপ শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তানজিম উল হক বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া মালিক ও শ্রমিকের প্রতারণামূলক চুক্তিপত্র দেখতে পাই। তবু অনেকে ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দিয়ে বিপদে পড়ছেন।' সন্তোষপুরের সাবেক ইউপি সদস্য মো. সামছুদ্দীন বলেন, মানব পাচারকারী প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে প্রতারণা কমবে না। পাশাপাশি বিদেশগামীদের জন্য প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে হবে।
দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ
সন্দ্বীপ উপজেলা কমপ্লেক্সের কাছে বিদেশে গমনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। গত বছর এই কেন্দ্র থেকে ৭৫০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে জানান কেন্দ্রের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শরফুদ্দিন। তিনি বলেন, বিদেশে যাঁরা যেতে চান, তাঁদের দক্ষ করে গড়ে তুলতেই এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রেডে প্রশিক্ষণার্থী রয়েছেন প্রায় ৩০০ জন।



