শাক বিক্রি করে সংসার চলে না, তবু টিকে থাকার লড়াই
শাক বিক্রি করে সংসার চলে না, তবু টিকে থাকার লড়াই

নামের শেষে মা-বাবা কেন ‘সাহেব’ শব্দ যুক্ত করেছেন, তা এখনো বুঝতে পারেননি ষাটোর্ধ্ব শাক বিক্রেতা হক সাহেব। তাঁর কথায়, নামের সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। প্রতিদিন সকালে যাত্রাবাড়ীর পাইকারি কাঁচাবাজার থেকে শাক কিনে ঝুড়ি মাথায় করে ধলপুরের বউবাজারে নিয়ে যান তিনি। সকাল নয়টা থেকে শুরু হওয়া তাঁর টিকে থাকার লড়াই চলে গভীর রাত পর্যন্ত।

শরীর ভালো না থাকায় দেরি

গতকাল সোমবার দুপুরে হক সাহেবের সঙ্গে দেখা হলে তিনি মাথায় শাকের বোঝা নিয়ে বউবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। ঝুড়ির ভারে বাঁশের চটার মতো শরীর ধনুকের মতো বেঁকে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে গল্প শুরু করলাম তাঁর সঙ্গে। কথায় কথায় জানান, শরীর ভালো না থাকায় খানিকটা দেরি করে বের হয়েছেন। কী হয়েছে জানতে চাইলে হেসে বলেন, ‘গরিবের কথা শুইনা কী হইব। গরিবের খোঁজখবর আর কে রাখে বাজান।’

সাত-আট বছর ধরে শাক বিক্রি

সাত-আট বছর ধরে বউবাজারে শাক বিক্রি করে সংসার চলছে হক সাহেবের। পাটশাক আর কলমিশাক। ধলপুরে এক কক্ষের একটি ঘরে মেয়ে ও অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন তিনি। জানান, এক আঁটি শাক বিক্রি করলে লাভ হয় তিন থেকে চার টাকা। আর মাসে ঘরভাড়া দিতে হয় ছয় হাজার টাকা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হক সাহেব বলেন, ‘শাক বেইচ্যা যে আয় হয়, তাতে সংসার চলে না। জিনিসপাতির দাম দিন দিন বাড়তেছেই। সংসার চালাইতে অসুস্থ বউটারেও দুই বাড়ি কাজ করন লাগে। এর পরও ওষুধপত্তর কিনতে ধার-কর্জ করাই লাগে।’

কথা বলতে বলতে বউবাজার

কথা বলতে বলতে বউবাজার এসে গেল। মাথা থেকে ঝুড়ি নামিয়ে হক সাহেব বসে পড়লেন তাঁর নির্ধারিত জায়গায়। বললাম, ‘শাক বিক্রি করে আর কত দিন, অন্য কোনো পরিকল্পনা নেই?’ ম্লান হেসে জবাব দিলেন, ‘আমার বয়স শেষ। আর কী করমু কন। মনে আর জোর পাই না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘বেচন-বিক্রি কইমা গ্যাছে’

ধলপুর এলাকার এই বউ বাজারে অধিকাংশই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সরু সড়কের পাশে অল্প কিছুটা জায়গায় পলিথিন বিছিয়ে কেউ শাকসবজি, কেউ মসলা, কেউ আনাজপাতি বিক্রি করেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এখানে বসে ব্যবসা করেন। তেমনই একজন সাহেদা বেগম। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এই বাজারে ব্যবসা করছেন। লেবু, টমেটো, কাঁচা মরিচ আর আলু নিয়ে বসেন তিনি।

দুই ছেলেমেয়ে ও স্বামী নিয়ে সাহেদা বেগমের সংসার। তিনি জানান, স্বামী রিকশা চালালেও পুরো সংসারের চাপ তাঁর কাঁধেই। তাই সকাল থেকেই সবজি নিয়ে বসতে হয় বাজারে। ব্যবসার অবস্থা জানতে চাইলে সাহেদা বেগম বলেন, ‘বেচন-বিক্রি কইমা গ্যাছে। লাভ আগের মতন অয় না।’ কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘কইতে পারি না।’

‘মাইনসের হাতে টেকাপয়সা নাই। জিনিসপত্তর কেনা কমায়ে দিছে। মাইনসে না কিনলে ব্যবসা থাকব কইত্তে’—উত্তর দিলেন সাহেদা বেগমের পাশে বসা আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জমির হোসেন। তাঁর সামনে একটি পাত্রে মুরগির পা, মাথা, গিলা-কলিজা আর মাংস ছাড়া হাড়গোড়। জমির হোসেনের বয়স ৬০ ছুঁই ছুঁই। রাজধানীর কাপ্তান বাজার থেকে মুরগির এসব অংশ কিনে এনে প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি করেন। এতেই কষ্টেসৃষ্টে চলে তাঁর পাঁচ সদস্যের পরিবার।

এগুলো কারা কেনে জানতে চাইলে জমির হোসেন বলেন, ‘হোটেলে লয় কিছু। আবার এমনি কাস্টমারও লইয়া যায়।’ তবে আগে যতগুলো হোটেলে মাল বিক্রি করতেন, তা বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে। হেসে বলেন, ‘চলতে কষ্ট হয়, সংসারে টানাটানি। তারপরও আল্লাহ ভরসা।’

‘জন্মের তে জ্বলছি’

বাজারের এই টানাপোড়েন শুধু হক সাহেব, সাহেদা বেগম বা জমির হোসেনদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, একই লড়াই করছেন শহরের আরও অনেকে। যাঁদের জীবনের গল্পও প্রায় একই রকম কঠিন বাস্তবতায় গাঁথা।

এক বছর আগেও রাজধানীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন বাচ্চু মিয়া। আয় একেবারে খারাপ ছিল না। তবে শরীর সায় দেয়নি। দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টের কারণে কাজ ছেড়ে দিতে হয়। এখন সপ্তাহে ছয় দিন মতিঝিল এলাকায় ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। আর এক দিন বিশ্রাম নেন।

গতকাল দুপুরে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে কথা হয় বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, মুড়ি বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে চারজনের চলতে টানাটানি হয়। চল্লিশোর্ধ্ব বাচ্চু মিয়ার কাছে জানতে চাইলাম নতুন কিছু করার পরিকল্পনা আছে কি না। জবাবে বলেন, ‘স্বপ্ন তো স্যার আছেই একটা দোকান লইয়া যদি বসতে পারি। তয় যেই আয় হয় আর যেই খরচ, তার লগে তো স্বপ্ন মিল খায় না।’

কথা শেষে যখন ফিরে আসছি পেছন থেকে ডাক দিয়ে বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘একটু দোয়া করবেন স্যার। আমার একটু ভালো কিছু জানি হয়। জন্মের তে জ্বলছি।’