জ্বালানি সংকটে সুনামগঞ্জের কৃষকদের ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তা, হারভেস্টার যন্ত্রপাতি অচল
দেশের শস্যভান্ডার খ্যাত সুনামগঞ্জের কৃষকরা বর্তমানে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে পাকা ধান কাটা নিয়ে মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন। একদিকে, বৃষ্টিপাতের কারণে হাওর অঞ্চলের জমির মাটি নরম ও জলাবদ্ধ হয়ে উঠায় হারভেস্টার মেশিন চলাচল করতে পারছে না; অন্যদিকে, ডিজেলের অপ্রতুল সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধি তাদের ফেলে দিয়েছে গভীর দুশ্চিন্তায়। চাষিরা চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার মেশিনসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে চালাতে অক্ষম হচ্ছেন, যা ফসল কাটার মৌসুমে ব্যাপক সমস্যা সৃষ্টি করছে।
ধান কাটার মৌসুমে জ্বালানি তেলের অভাব ও মূল্যবৃদ্ধি
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্যেই জেলার প্রায় সব হাওরেই ধান পাকতে শুরু করেছে, এবং পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির আশঙ্কাকে মাথায় রেখে কৃষকরা দ্রুত পাকা ধান ঘরে তুলতে মাঠে নেমেছেন। কিন্তু, ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় হারভেস্টার মালিকরা চাহিদা অনুযায়ী ধান কাটতে পারছেন না, ফলে পুরো প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের একজন হারভেস্টার মালিক লিলু মিয়া জানান, দিনে-রাতে ধান কাটার কাজে যে পরিমাণ তেলের প্রয়োজন, সেই পরিমাণ তারা নিয়মিত পাচ্ছেন না। প্রশাসনের প্রত্যয়ন অনুযায়ী ১০০ লিটার তেল সংগ্রহ করতেও নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, আর খুচরা বাজারে তেল মিললেও বাড়তি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এছাড়া, বৃষ্টিপাতের কারণে নিচু এলাকার জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে, যা হারভেস্টার মেশিনের চলাচলকে আরও কঠিন করে তুলছে।
হারভেস্টার মেশিনের জ্বালানি চাহিদা ও কৃষকদের বাড়তি খরচ
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় সহস্রাধিক কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার মেশিন রয়েছে। একটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিন-রাতে ৬০-৭০ বিঘা জমির ফসল কাটতে সক্ষম, যার জন্য প্রতিদিন প্রতি মেশিনে ১২০-১৫০ লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। জেলার হাওরগুলোতে ধান কাটা শুরু হয়ে গেলেও জ্বালানি সংকটের কারণে সংশ্লিষ্টরা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
জেলার বিভিন্ন হাওরে সরজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ জমিতে পাকা ও আধাপাকা ধান রয়েছে, কিন্তু শ্রমিক সংকটও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কৃষকরা উল্লেখ করেন যে, বৈশাখ মাসে তারা বহুকাল ধরে সনাতন পদ্ধতিতে ধান কাটতেন, কিন্তু হারভেস্টার মেশিনের প্রচলন আসার পর থেকে তারা মেশিননির্ভর হয়ে পড়েছেন। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি কৃষি খাতে প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে হাওরে হারভেস্টারের সংখ্যা কমে গেছে এবং ধান কাটতে একজন কৃষককে ৫-৭ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
খরচের দিক থেকে, গত বছর বিঘাপ্রতি ধান কাটার খরচ ছিল ১৭০০-১৮০০ টাকা, কিন্তু এবার অতিরিক্ত ৫০০-৭০০ টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে কৃষকদের। শান্তিগঞ্জের আস্তমা গ্রামের কৃষক খালিক দেওয়ান বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ানোর কারণে মেশিনের মালিকরা ধান কাটার খরচ বৃদ্ধি করেছে। কেয়ার প্রতি ২৫০০ টাকা দিয়েও হারভেস্টার পাওয়া যাচ্ছে না, এবং ধান কাটতে আগে তালিকায় নাম উঠাতে হয়।’
প্রশাসনের ভূমিকা ও কৃষকদের হতাশা
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিঘাপ্রতি ধান কাটার খরচ ১৯০০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও, তেল সংকটের অজুহাতে কৃষকদের ২৩০০-২৫০০ টাকা দরে ধান কাটতে হচ্ছে। এতে চাষাবাদ ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা গভীর হতাশায় ভুগছেন। তারা জানান, ধানের বাজার মূল্য কম থাকায় এবার মুনাফা হবে না বলেই আশঙ্কা করছেন, তাই ধান কাটার মৌসুমে জ্বালানি তেলের দাম সহনশীল পর্যায়ে রাখার জোর দাবি তুলেছেন।
সেলিম মিয়া নামের এক কৃষক বলেন, ‘ধান আর কয় মণই পাই, বেশি হলে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ১৮ মণ। বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ যাচ্ছে ১০ হাজার টাকা, সারাবছরের শ্রম তো আছেই। ধানের মূল্য অনেক কম, এভাবে চলতে থাকলে কৃষিতে লাভবান হওয়া যাবে না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলার বেশির ভাগ হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে, এবং হারভেস্টারের জ্বালানি তেলের সংকট নেই বলে আমরা জানি। তেল সরবরাহে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, হারভেস্টার মালিকদের মেশিনপ্রতি দিনে ১০০ লিটার তেল প্রদান করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে প্রত্যয়ন দিতে বলা হয়েছে। জ্বালানি তেল পেতে সমস্যা হলে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নেবো।’
তবে, কৃষকদের মতে, বাস্তব অবস্থা ভিন্ন, এবং জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এবারের ফসল ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।



