কিশোরগঞ্জ হাওরে বোরো ধান মাড়াই শুরু, ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ কৃষক
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন হাওর থেকে নৌকাভর্তি ধানের বস্তা করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরের আড়তে আনা হচ্ছে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় নিম্ন মূল্যে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের আক্ষেপ: ধানের দাম বাড়ে না, শ্রমিকের দাম বাড়ে
নিকলী উপজেলার মজলিশপুর এলাকার কৃষক জুলহাস মিয়া বলেন, 'এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। এক দিনের জন্য ধান কাটার শ্রমিককে দিতে হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। কৃষকেরা সবচেয়ে অবহেলিত, আমাদের দুঃখের কথা কেউ শোনে না।'
করিমগঞ্জ উপজেলার কৃষক মজিবুর রহমান একই সুরে যোগ করেন, 'কৃষকেরা এত কষ্ট করে ধান ফলায়, সেই ধান সস্তায় কিনে নিয়ে মিল আর চাতালের মালিকেরা চালের দাম ঠিকই বাড়িয়ে দেয়। সস্তা এই ধানের সময়ে এখনো ২৫ কেজি চালের বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। ধানের দাম নাই, চালের দাম অনেক বাড়তি। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—নীতিনির্ধারকদের এই কথাটা মনে রাখতে হবে।'
হাওরাঞ্চলের ধানবাণিজ্যের কেন্দ্র চামড়া নৌবন্দর
করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়া নৌবন্দর হাওরাঞ্চলের ধানবাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন এখানে হাজারো মণ ধান কেনাবেচা হয়। কৃষকেরা ভেজা ও শুকনা ধান বস্তায় ভরে ছোট-বড় নৌকায় করে ঘাটে এনে আড়তে বিক্রি করেন। আড়তদারেরা সেগুলো ট্রাকে করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলার চালকলে পাঠান।
গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, নাগচিন্নি নদের তীরে সারি সারি আড়তঘর। নদীতে নোঙর করা ধানবোঝাই নৌকা থেকে শ্রমিকেরা বস্তা মাথায় করে আড়তে তুলছেন। সেখান থেকে আবার ট্রাকে করে ধান পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
কৃষকদের হতাশা ও উৎপাদন খরচের চাপ
ইটনা বড়িবাড়ি হাওর থেকে ৩০০ বস্তা ধান নিয়ে আসা কৃষক মালেক মিয়া বলেন, এবার তিনি প্রায় সাত একর জমিতে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ ও হাইব্রিড হীরা জাতের ধান চাষ করেছেন। ব্রি-২৮ কিছুটা রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যগুলোর ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম না পেয়ে তিনি হতাশ। আড়তদারেরা হাইব্রিড হীরা ধানের দাম দিচ্ছেন ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ। বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিবছরই ধানের মূল্য কম থাকে। তবে এবারের মতো এত কম দাম আগে ছিল না।
নিয়ামতপুর এলাকার কৃষক খোকন মিয়া জানান, লাভ কম হওয়ায় এবার তিনি কম জমিতে চাষ করেছেন। তাঁর ব্রি-২৯ জাতের ধান ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ বিক্রি করতে হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ১০০ টাকা কম। অথচ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ইটনা সদরের কৃষক কামরুল ইসলাম ১৫ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি একরে ৭০ থেকে ৮০ মণ ধান উৎপাদন হলেও দাওয়াল, মাড়াই, পরিবহনসহ নানা খরচে অনেকটাই চলে যায়। শেষে খুব সামান্য লাভ থাকে।
কৃষক আবদুল হক বলেন, এক একর জমি পত্তন নিতে লাগে প্রায় সাত হাজার টাকা, শ্রমিক খরচ ছয় হাজার, চাষ দেড় হাজার, সার তিন থেকে চার হাজার, রোপণ দুই থেকে আড়াই হাজার, সেচ তিন থেকে চার হাজার টাকা। এত খরচ করে শেষে হাতে থাকে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। ধানের দাম না বাড়লে কৃষকের মরণ ছাড়া উপায় নেই।
কৃষি বিভাগের তথ্য ও পরামর্শ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে চাষ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, 'কিশোরগঞ্জ খাদ্যে উদ্বৃত্ত জেলা। এখানে বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, ধানের দাম কম। আমরা উৎপাদন খরচের হিসাব করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। আমরা চাই, কৃষকেরা যেন তাঁদের কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান। এবার ভালো ফলনে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। এক সপ্তাহ ধরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে আগামী সপ্তাহে পুরোদমে কাটা হবে। কৃষকদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, জমির ধান ৮০ ভাগ পেকে গেলেই যেন কেটে ফেলেন। বলা যায় না, শিলা বৃষ্টি ও আগাম পানির কারণে তাঁরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।'
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। তার ওপর ভালো ফলনের বছরেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাঁরা হতাশায় ভোগেন। এতে ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।



