ইলিশের আকার ছোট হচ্ছে, উৎপাদন কমছে: নিয়ন্ত্রণহীন আহরণ ও নদী দূষণ দায়ী
ইলিশের আকার ছোট, উৎপাদন কমছে: নিয়ন্ত্রণহীন আহরণ দায়ী

ইলিশের আকার ছোট হচ্ছে, উৎপাদন কমছে: নিয়ন্ত্রণহীন আহরণ ও নদী দূষণ দায়ী

বর্তমানে বাজারে আসা ইলিশের প্রায় সবই ছোট আকারের। গত এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ আহরণ বাড়ার পর হঠাৎ ধস নেমেছে। গত দুই বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। সেই সঙ্গে দেশে ধরা পড়া ইলিশের আকার আগের চেয়ে আরও ছোট হয়েছে। মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশের আকার ছোট হওয়ার পেছনে কোনো বাস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব তাঁরা দেখছেন না। তাঁদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন ইলিশ আহরণ এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়াই সমস্যার মূল কারণ।

আহরণ কমছে, ধরা পড়ছে ছোট ইলিশ

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমেছিল ৪২ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরিত হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, যা পরের বছর কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে; আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও ২৯ হাজার টন কমে নেমে আসে ৫ লাখ টনে। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশের আহরণ কমেছে মোট ৭১ হাজার টন, যা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা।

মৎস্য অধিদপ্তর ‘ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাত বছর আগে বাংলাদেশের ইলিশের ওজন ছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ গ্রামে নেমে এসেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমেছে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চিতে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইলিশ এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দ্রুত বড় হয়। একটি জাটকা এক বছর বাঁচলে সেটির আকৃতি ১১ দশমিক ৮১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। একটি ইলিশ পাঁচ থেকে সাত বছর বেঁচে থাকলে ২২ দশমিক ৬৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনিয়ন্ত্রিত ইলিশ আহরণের প্রভাব

প্রায় এক দশক ধরে দেশে ইলিশ আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছিল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ডফিশ’-এর ‘ইকোফিশ-অ্যাকটিভিটি’ প্রকল্পের যুক্ততাকে এ সাফল্যের পেছনের কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্যবিজ্ঞান ও মৎস্য চাষ বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল ওহাব ইলিশের সংকট প্রসঙ্গে বলেন, ইলিশের আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ আহরণই বড় কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, জাটকানিধন ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে এ সংকট আরও গভীর হতে পারে।

জাটকা নিধনের ধাপ

বঙ্গোপসাগর–তীরবর্তী বরগুনার তালতলী উপজেলার জেলে দুলাল হোসেন প্রায় ৩০ বছর ধরে সাগর ও নদীতে মাছ ধরছেন। তাঁর ভাষায়, ইলিশের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে সেগুলো ধরে ফেলা হয়।

দুলাল হোসেন বলেন, জাটকানিধন মূলত তিন ধাপে ঘটে। প্রথম ধাপে একেবারে ছোট বাচ্চা, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাপিলা মাছ’ নামে বাজারে বিক্রি হয়, সেগুলো ধরা পড়ে। এ পর্যায় থেকে যেসব বাচ্চা রক্ষা পায়, সেগুলো পরে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে নির্বিচার ধরা হয়। এর পরও যেসব জাটকা বেঁচে সাগরের দিকে যেতে পারে, সেগুলোকে বড় ট্রলিং ট্রলার এবং কাঠের রূপান্তরিত ট্রলিং ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা হয়। এতে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগই পাচ্ছে না।

নদী দূষণ ও পরিবেশগত সমস্যা

মৎস্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুকূল প্রতিবেশব্যবস্থা না থাকলে মাছের আহরণ কমে যেতে পারে। যা মাছের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংটন) রয়েছে। এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে ৬৮ শতাংশ কমেছে। এর বড় কারণ নদীদূষণ।

গবেষণাটি করেছেন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে, যার প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও।

করণীয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ইলিশসহ দেশের প্রাকৃতিক উৎসের মাছের প্রজনন, বেড়ে ওঠা ও সুরক্ষায় করণীয় কী—এসব বিষয়ে মৎস্যবিজ্ঞানীরা বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।

বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর অন্যতম উর্বর সামুদ্রিক অঞ্চল। যেখানে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার পুষ্টিসমৃদ্ধ জলের ধারা মিশেছে। এমন পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন মৎস্যবিজ্ঞানী আবদুল ওহাব। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণের বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদ-নদী ঘিরে আমরা একটি নতুন অভয়াশ্রমের প্রস্তাব মৎস্য মন্ত্রণালয়ে দিয়েছিলাম। সেটি বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই তিন নদীর মোহনায় চর অপসারণ ও দেশের কোন নদীতে কী পরিমাণ দূষণ হচ্ছে, তার মাত্রা পরীক্ষা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

শুধু আইন বা ভয় দেখিয়ে জাটকা ধরা বন্ধ করা অসম্ভব উল্লেখ করে আবদুল ওহাব আরও বলেন, এ জন্য প্রয়োজন জেলেদের এই কাজে আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত করা। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময়ে যাতে জেলেরা আর্থিকভাবে দুর্দশায় না পড়েন, সে জন্য তাঁদের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিতের পাশাপাশি ঋণের কিস্তি যাতে না দিতে হয়, সেই ব্যবস্থা করা।

ইকো ফিশের উদ্যোগে তাঁরা দেশের ৪২০ কিলোমিটার অভয়াশ্রমের জিওগ্রাফিক সার্ভে করেছিলেন উল্লেখ করে অধ্যাপক আবদুল ওহাব বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে আমাদের পুরো নদীব্যবস্থার একটি বড় সার্ভে করা প্রয়োজন। দেখা প্রয়োজন কোথায় ডুবোচর আছে, কোথায় নাব্যতা–সংকট আছে, কোথায় দূষণের অবস্থা কেমন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারলে খুবই ভালো কাজ দিতে পারে।’ জাতীয় মাছ ইলিশের বায়োলজি ও কৌলিতত্ত্ব (জেনেটিকস) বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করা দরকার বলে মনে করেন এই মৎস্যবিজ্ঞানী।