পাবনার সাঁথিয়ায় পেঁয়াজের রেকর্ড ফলন, তবুও কৃষকের মুখে হাসি নেই: লোকসানে জর্জরিত
পাবনায় পেঁয়াজের রেকর্ড ফলন, তবুও কৃষকের লোকসান

পাবনার সাঁথিয়ায় পেঁয়াজের রেকর্ড ফলন, তবুও কৃষকের মুখে হাসি নেই: লোকসানে জর্জরিত

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের কৃষক মোতাহার হোসেন এ বছর এক বিঘা জমিতে হালি পেঁয়াজ আবাদ করে প্রায় ৮০ মণ ফলন পেয়েছেন, যা তাঁর জীবনে একটি অসাধারণ মাইলফলক। তবে এই রেকর্ড ফলন সত্ত্বেও তাঁর মুখে কোনো হাসি নেই, কারণ বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করে তিনি উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না। মোতাহার হোসেনের ভাষায়, ‘এক মণ পেঁয়াজ তুলতি এবার খরচ পড়িছে ১৪০০-১৫০০ টাকা, আর হাটে বেচা লাগতেছে ৮০০-১০০০ টাকায়। এত লোকসান হবি জানলি পেঁয়াজের আবাদে যাইত্যামই না।’ তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মণে ৫০০ টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা এক বিঘায় প্রায় ৪০ হাজার টাকা লোকসানের সমতুল্য।

সাঁথিয়ার কৃষকদের আফসোস: ফলন ভালো, দাম নিম্ন

মোতাহার হোসেন একা নন, সাঁথিয়া উপজেলার অধিকাংশ পেঁয়াজচাষিই একই সমস্যার মুখোমুখি। ভালো ফলন পেলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তারা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, এ বছর সাঁথিয়ায় মোট ১৬ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৬১০ হেক্টরে মুড়িকাটা (আগাম) এবং ১৫ হাজার ৮০ হেক্টরে হালি পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। মুড়িকাটা পদ্ধতিতে অক্টোবর-নভেম্বরে আবাদ করে ডিসেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পেঁয়াজ তোলা হয়, অন্যদিকে হালি পদ্ধতিতে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আবাদ করে মার্চ-এপ্রিলে পেঁয়াজ ঘরে তোলা হয়।

সাঁথিয়া উপজেলা পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য ‘পেঁয়াজের ভান্ডার’ হিসেবে পরিচিত, বিশেষ করে হালি পদ্ধতিতে উৎপাদিত পেঁয়াজ সারা বছর সংরক্ষণ করা যায় বলে এ অঞ্চলে এর আবাদ বেশি। চলতি বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে হালি পেঁয়াজের ফলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রতি বিঘায় দেশি জাতের পেঁয়াজের ফলন হয়েছে ৭০-৮০ মণ এবং হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজে ১৩০ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছেন কৃষকেরা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাজারে সরবরাহ বাড়া, দাম তলানিতে: কৃষকের হতাশা

ফলন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, কিন্তু সেই তুলনায় চাহিদা না থাকায় দাম একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে। বর্তমানে হাটভেদে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচ হয়েছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এতে প্রতি মণে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য একটি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

আজ সোমবার উপজেলার করমজা ও বোয়ালমারি হাটে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা প্রচুর পেঁয়াজ নিয়ে হাটে এলেও তাঁদের মুখে হাসি নেই। প্রায় সব জমির হালি পেঁয়াজ তোলা শেষ হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশায় ভুগছেন তারা। বোয়ালমারি হাটের পেঁয়াজ আড়তদার রাজা হোসেন বলেন, ‘এবার ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকেরা হাটে বেশি পেঁয়াজ আনতেছেন। কিন্তু সেই তুলনায় ব্যাপারী কম। তাই সরবরাহ বেশি এবং দাম কম। এখনকার বাজারদর অনুযায়ী কৃষকেরা প্রতি মণে প্রায় ৫০০ টাকা লোকসান দিতেছেন।’

কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য: ফলন ভালো, কিন্তু দাম কম

সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর পেঁয়াজের ফলন খুবই ভালো হয়েছে, যা বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির কারণ। তিনি উল্লেখ করেন, ‘ফলন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। সে কারণে দাম কমেছে। তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় দেশে পেঁয়াজের চাহিদায় ঘাটতি থাকবে না।’ এই পরিস্থিতি কৃষকদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যেখানে তারা রেকর্ড ফলন পেয়েও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

সারসংক্ষেপে, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় পেঁয়াজের রেকর্ড ফলন সত্ত্বেও কৃষকরা ন্যায্য দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা স্থানীয় কৃষি খাতের জন্য একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।