প্রকৃতি অনুসন্ধানে নরসিংদীর মরজাল ভ্রমণ
প্রকৃতি অনুসন্ধানে নরসিংদীর মরজাল ভ্রমণ

ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে মাত্র। পুব আকাশে রক্তিম সূর্যের আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আবাসিক এলাকা প্রায় নিস্তব্ধ। দু–একজন মানুষ নীরব সকালে হাঁটছেন। ৮ মে শুক্রবার, সকাল ছয়টা। আমাদের গাড়ি প্রস্তুত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে চার গবেষণাসঙ্গীকে নিয়ে শুরু হলো আমাদের প্রকৃতি-অনুসন্ধানী যাত্রা। গন্তব্য নরসিংদীর মরজাল।

যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা

যাত্রাপথে পূর্বাচলের জিয়া চত্বরে গাড়ি থামিয়ে তাহের রেস্টুরেন্টে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। নাশতা শেষে আবার রওনা হলাম। কাঞ্চন ব্রিজ পার হওয়ার সময় তীব্র যানজটে পড়তে হলো। অনেক কষ্টে সেই জট পার হয়ে গাউছিয়ার রাস্তা এড়িয়ে ছনবাড়ির পথ ধরে এগিয়ে চললাম। সকাল দশটার দিকে পৌঁছে গেলাম মরজাল বাজারে।

মরজাল বাজারের ফলমূল ও সবজি

উদ্দেশ্য ছিল মরজালের সকালের বাজার ঘুরে দেখা। কী ধরনের ফলমূল ও সবজি বিক্রি হয়। সেদিন বাজারে ছিল কেবল কিছু কাঁচা আম, কাঁঠাল আর কয়েক ঝুড়ি লেবু। মরজাল তথা রায়পুরা লটকন চাষের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু এখনো পরিপক্ব হয়নি। আমরা সামান্য কিছু লেবু কিনলাম। তারপর এক ফল বিক্রেতার সঙ্গে আলাপ করলাম। তাঁর কাছ থেকেই জানলাম আশপাশের কোন গ্রামে গেলে লটকন ও কাঁঠালের বাগান কিংবা অন্য কোনো আকর্ষণীয় ফলবাগান দেখা যেতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নার্সারি পরিদর্শন ও চারা সংগ্রহ

আমাদের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ভালো কোনো নার্সারি খুঁজে বের করা। সেখান থেকে উন্নত জাতের ফলের চারা সংগ্রহ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রোপণ করা। মরজাল বাজার থেকে উত্তর দিকে গাবতলী অতিক্রম করে কিছু দূর যেতেই রাস্তার পাশে চোখে পড়ল ‘আনন্দ নার্সারি’। নার্সারির মালিক আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের স্বাগত জানালেন। তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করলাম উন্নত জাতের লটকন, বানানা ম্যাঙ্গো, তেজপাতা ও কুলের চারা। পরে তিনি আমাদের আরেকটি নার্সারিতে নিয়ে গেলাম। সেখানে পেলাম বঁইচি ফল, ব্লিডিং হার্ট ও উন্নত জাতের পেয়ারার চারা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া গাছ

আমরা জানতে চাইলাম উদালগাছ, মেন্দাগাছ, পদ্মগুরুজ কিংবা গাছ আলু এখনো দেখা যায় কি না। নার্সারির মালিক জানালেন, ‘একসময় ছিল, এখন আর সহজে দেখা যায় না। মানুষের অতিরিক্ত সংগ্রহের কারণে প্রকৃতি থেকে অনেক গাছই হারিয়ে গেছে।’ কথার ফাঁকে চোখে পড়ল একটি বড় শিমুল ও চাপাট্টা বৃক্ষ। নার্সারির মালিক আমাদের কিছু পরিপক্ব ডাল উপহার দিলেন, যেন কাটিংয়ের মাধ্যমে নতুন গাছ তৈরি করা যায়। একটি কাঁচা কাঁঠালও উপহার দিলেন তিনি।

গ্রামের লটকনবাগান ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ

এরপর আমরা গ্রামের ভেতরে ঢুকে একটি ছোট লটকনবাগানের সামনে গাড়ি থামালাম। এলাকার মানুষের সঙ্গে গল্প করতে করতে জানলাম তাঁদের জীবন, প্রকৃতি আর ফলের গাছের প্রতি ভালোবাসার কথা। এ অঞ্চলের প্রকৃতি সত্যিই ভিন্নধর্মী। লালচে মাটি, উঁচু–নিচু ভূমি। উঁচু জমিতে বাড়িঘর ও বাগান, নিচু জমিতে ফল গাছ আর বোরো ধানের চাষ।

সোনাইমুড়ি টিলায় প্রকৃতি দর্শন

এরই মধ্যে সূর্য মাথার ওপরে উঠে এসেছে। ঘড়িতে দুপুর ১২টা। জুমার নামাজের প্রস্তুতিও নিতে হবে। তাই দ্রুত রওনা হলাম সোনাইমুড়ি টিলার দিকে। সিলেট যাত্রাপথে বহুবার এখানে থেমেছি। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রকৃতি দেখার আলাদা এক প্রশান্তি আছে। আমরা পাহাড়ে কাঁঠাল, ছাগলনাদি, পিছলা প্রভৃতি বৃক্ষের ছবি তুললাম। তবে একটি দৃশ্য মন খারাপ করে দিল—একজন লোক কাঁঠালগাছে ওষুধ স্প্রে করছিল। তিনি বললেন, পোকামাকড় দমনের জন্য। কিন্তু মনে হলো, হয়তো দ্রুত পাকানোর জন্যই রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

পূর্বাচলের শালবনে বুনো বৃক্ষ

নরসিংদী সার্কিট হাউসে দুপুরের খাবার সেরে আবার রওনা দিলাম পূর্বাচলের দিকে। বিকেল চারটার দিকে পৌঁছালাম পূর্বাচলের শালবনে। সেখানে ফুটেছিল ভূতি জামের ফুল। দুই ধরনের এন্নাগাছ চোখে পড়ল। স্ত্রী গাছে ছোট ছোট ফল এসেছে। আরও দেখা মিলল ছাগলনাদি, শাল, সোনালু, আকন্দ ও নানা বুনো বৃক্ষের। বহু খোঁজার পরও উদালগাছের দেখা পেলাম না।

স্থানীয় বাজার পর্যবেক্ষণ

আমরা পূর্বাচলের দিয়া চত্বরের লাইনে এসে স্থানীয় বাজার পর্যবেক্ষণ করলাম। সেখানে অনেক প্রজাতির দেশীয় ফলমূল ও সবজি বিক্রি হচ্ছিল। দাম অনেক চড়া। তারপরও কিছু বিলাতি ধনেপাতা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, কাঁচা আম কিনলাম বাসার জন্য।

ঢাকায় প্রত্যাবর্তন

সূর্য পশ্চিম দিগন্তে নেমে পড়েছে। সাড়ে পাঁচটার দিকে আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। সূর্যাস্তের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি সংলগ্ন গেটে পৌঁছে সংগৃহীত চারা ও নমুনাগুলো রেখে দিলাম পরবর্তী গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য। মাগরিবের আজানের সময় শহীদ গিয়াসউদ্দিন আবাসিক এলাকার বাসায় এসে পৌঁছালাম। এভাবে আমাদের সারাটা দিনের প্রকৃতি ভ্রমণ শেষ হলো।

প্রকৃতি সংকোচনের উদ্বেগ

কোথাও নতুন বাড়িঘর হচ্ছে, কোথাও মার্কেট হচ্ছে, কোথাও ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে, কোথাও শহর বর্ধিত হচ্ছে। দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে প্রকৃতি। আমরা শহর গড়ার জন্য কতটুকু জমি অধিগ্রহণ করব, শিল্পাঞ্চলের জন্য কতটুকু নেব আর কতটুকু প্রকৃতি হিসেবে রেখে দেব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।

মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়