বরিশাল নগরের সিঅ্যান্ডবি সড়কটি ঢাকা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কের অংশ। নগরের চৌমাথা এলাকায় মহাসড়কের একটি বাইলেন ও দুই ব্যক্তির জমি দখল করে মায়ের নামে শিশুপার্ক নির্মাণ করেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। নয় কোটি টাকা ব্যয়ে অপরিকল্পিতভাবে পার্কটি করে অর্থ অপচয় করা হয়েছে। সড়কের এই অংশ সড়ক ও জনপথের আওতায় থাকলেও সংস্থাটির অনুমতি নেওয়া হয়নি। ব্যস্ততম মহাসড়কের পাশে পার্ক নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে শুরু থেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন নগরবাসী। তাতে কোনো কর্ণপাত করেননি সাদিক আব্দুল্লাহ। অবশেষে স্থাপনাটি অপসারণ শুরু করেছে সিটি করপোরেশন।
অপসারণ কার্যক্রম শুরু
একইসঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে জনগণের টাকা অপচয় করে পার্কের নামে টাকা লুটপাটের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে সিটি করপোরেশন। বুধবার সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের উপস্থিতিতে নগরীর সিঅ্যান্ডবি রোড চৌমাথা লেক সংলগ্ন পার্কটির অবশিষ্ট অংশ অপসারণ শুরু করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এবং তার পরের দিন মহাসড়কের ওপর নির্মিত ওই পার্কটি ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। সিটি করপোরেশন ও সড়ক জনপদ বিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালিতে আটকে ছিল অবশিষ্ট অংশ অপসারণ।
পার্ক নির্মাণের ইতিহাস
প্রায় দুই বছর পর নিরাপদ সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে মহাসড়কের ওপর থেকে পার্কের অবশিষ্ট অংশ উচ্ছেদ শুরু হয়। ২০২২ সালে সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের সিঅ্যান্ডবি রোডে সড়ক ও জনপদের জমিতে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহান আরা বেগম পার্ক’।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, সওজের আওতাধীন ঢাকা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কটির প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশ বরিশাল নগরের মধ্য দিয়ে গেছে। ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত দুই লেনের জাতীয় এই মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়ার কথা আছে। এই প্রকল্পের আওতায় এই অংশও রয়েছে। ফলে পার্ক অপসারণ করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে মহাসড়কের একটি বাইলেন ও অন্য দুই ব্যক্তির মালিকানাধীন জমি দখল করে পার্ক করেন সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ। মৃত মায়ের নাম অনুসারে এটির নামকরণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহান আরা বেগম পার্ক। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর এর উদ্বোধন করা হয়।
অনিয়ম ও দুর্ঘটনা
সওজের বরিশাল বিভাগীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পার্কটি নির্মাণের জন্য মহাসড়কের পাশে থাকা ২৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করেছিল সিটি করপোরেশন। ওসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখল করা হয়েছিল। সেইসঙ্গে সিঅ্যান্ডবি সড়কের সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের লেকের উত্তর পাড় থেকে কাজীপাড়া সড়কের মুখ পর্যন্ত মূল মহাসড়ক ও বাইলেনের মধ্যের সড়ক বিভাজক ভেঙে ফেলা হয়েছিল। মহাসড়কের বাইলেন অংশে পার্কের একটি অংশ পড়ায় পাশের ড্রেন ভাঙা হয়েছে। এমনকি পার্কের সঙ্গে হোটেলের জন্য হাতেম আলী কলেজের জমি দখল করে দোতলা গোল চত্বর নির্মাণ করা হয়। এসবের জন্য সওজ কিংবা ট্রাফিক বিভাগের অনুমতি নেওয়া হয়নি। সড়কের সাড়ে ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৩০ ফুট প্রস্থের জায়গা দখল করে আট কোটি টাকায় এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ঠিকাদার ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শেখ সাঈদ আহমেদ মান্না।
তবে শুরু থেকে নগরবাসী এবং সুশীল সমাজ এ নিয়ে প্রতিবাদ জানালেও সাদিক আব্দুল্লাহ কারও কথা শোনেননি। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির মালিকরা আদালতের দ্বারস্থ হলে পার্ক নির্মাণের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল। তাও মানেননি সাদিক। ক্ষমতার জোরে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণ শেষ করে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারকে সঙ্গে নিয়ে দোয়া মোনাজাতের মধ্য দিয়ে পার্কের উদ্বোধন করেন।
পার্কের আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন মালিক জানিয়েছেন, পার্ক নির্মাণের ফলে চৌমাথা এলাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। দুই দিকে চওড়া মহাসড়ক পার হয়ে পার্কের সামনে এসে সড়ক সরু হয়ে যাওয়ায় দুই দিকের যানবাহনের সংঘর্ষে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা। সর্বশেষ ৫ আগস্ট পার্কের সব রাইড ভাঙচুর করে লুটপাট চালানো হয়। ওই দিন নগরের আরও কয়েকটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় নগরবাসী উদ্বেগ প্রকাশ করলেও পার্ক ভাঙচুরে অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এটি সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
অর্থ অপচয়ের অভিযোগ
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নয় কোটি টাকা ব্যয় করে পার্কটি নির্মাণ করা হয়। সিটি করপোরেশনের ফান্ড থেকে এই অর্থ দিয়েছেন তৎকালীন মেয়র সাদিক। এই টাকার মালিক নগরবাসী। পরবর্তী সময়ে সাবেক মেয়র সাদিকের চাচা খোকন সেরনিয়াবাত চেষ্টা চালিয়েও পার্ক অপসারণে ব্যর্থ হন।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পার্কটি অপসারণ করার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু তাও ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে বর্তমান প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করে নগরবাসী। তারই পরিপ্রেক্ষিতে অপসারণ শুরু হয়।
প্রশাসকের বক্তব্য
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ‘যখন মহাসড়ক ও ব্যক্তির জমি দখল করে পার্ক নির্মিত হচ্ছিল তখন বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হলেও তৎকালীন মেয়র তা উপেক্ষা করে তার মায়ের নামে পার্ক গড়েন। আমি প্রশাসকে দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরবাসী থেকে প্রধান আবেদন আসে পার্ক অপসারণের। এ ছাড়া পার্ক করায় যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। ওই স্থানে দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। সব দিক বিবেচনা করে অপসারণ করছি। কাজটি দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে মহাসড়কের জমি সড়ক জনপথের কাছে এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন যাদের জমি রয়েছে, তাদের জমিও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’
বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন আরও বলেন, ‘যে টাকা ব্যয় করে পার্ক করা হয়েছে তা জনগণের। সেই টাকার হিসাব দিতে হবে। পার্ক করার নামে অনেক টাকা লুটপাট হয়েছে। তারও হিসাব নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনে আর যাতে এ ধরনের অবৈধ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কেউ করতে না পারে, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাবো। আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এই অর্থ অপচয়ের হিসাব চেয়ে আদালতে মামলা করবো।’



