হাওরে ধান তলিয়ে গোখাদ্য সংকটে কৃষক, গরু বিক্রির চিন্তা
হাওরে ধান তলিয়ে গোখাদ্য সংকটে কৃষক, গরু বিক্রির চিন্তা

সুনামগঞ্জের নীলপুর গ্রামের কৃষক আবু বকর (৬৫) গ্রামের পাশে দেখার হাওরে এবার ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। ছয় বিঘা জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাকি চার বিঘার ধান কোনো রকমে টেনেটুনে তুলেছেন। ঘরে তার ছয়টি গরু আছে। ধানের খড় থেকেই পুরো বর্ষায় এই গবাদিপশুর খাবার হয়। কিন্তু এবার ধান তলিয়ে যাওয়ায় চাহিদামতো খড় পাননি। তাই বর্ষায় গরুগুলোকে কী খাওয়াবেন, এই চিন্তায় পড়েছেন।

গোখাদ্য সংকটে অনেক কৃষক

শুধু আবু বকর একা নন, এবার ঘরের গবাদিপশুর জন্য খড় সংগ্রহ করতে পারেননি অনেক কৃষক। তাই বর্ষায় সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় গোখাদ্যের সংকটে পড়তে হবে বলে জানিয়েছেন অনেকে। অনেকে গরু বিক্রির চিন্তাও করছেন। বিশেষ করে সামনে কোরবানির ঈদ থাকায় ঘরের গরু বিক্রি করতে পারেন অনেক কৃষক।

বৃহস্পতিবার বিকেলে হাওরপারে খড় শুকানোর কাজে থাকা অবস্থায় আবু বকর বলছিলেন, হাওরের এবার অনেক কৃষকই ধান পায়নি। এমনিতেই সংকট থাকবে। তার ওপর ঘরের গরুর খড় জোগাড় করতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন তারা। তিনি নিজেও ঈদের বাজারে দুটি গরু বিক্রির কথা ভাবছেন। এতে জমি আবাদের সময় করা ঋণ শোধ করবেন, একই সঙ্গে খড় না থাকার সংকট থেকে মুক্তি পাবেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পচা ধানের খড়ে গন্ধ, গরু খেতে চায় না

কৃষকেরা জানান, পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গোখাদ্য সংগ্রহ করা যায়নি। আবার পানির নিচে বেশি দিন থাকার পর যে ধান কাটা হয়েছে সেগুলো অনেকটা পচে গেছে। পচা ধানের খড় ভালো হয় না; গন্ধ থাকে। গরু খেতে চায় না।

একই এলাকার কৃষক নাসির মিয়া (৫০) জানান, তিনি ২৫ বিঘা জমি আবাদ করেছিলেন। তাঁর অর্ধেক জমিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ঘরে গরু আছে ১১টি। প্রতিবছর যে পরিমাণ ধানের খড় পান এবার তার অর্ধেকও তুলতে পারেননি। বৃষ্টির কারণে ধান কাটা ও মাড়াই করাই মুশকিল ছিল। তখন খড় নিয়ে চিন্তাই করতে পারেননি। নাসির মিয়া বলেন, ‘আমরার ত ইবার নিজের খানির ধান গেল, এর লগে গরুর খানিও নাই। দুইভাবে সংকটে আছি। নিজেরা ত একলাখান চলমু, গরু কি-লা ফালতাম ইটাই ভাবতাছি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্ষায় হাওরে গরু চরানোর সুযোগ নেই

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনো হাওরের কান্দায় (উঁচু অংশ) পানি আসেনি। তাই আপাতত গরু চরানো যাচ্ছে। এখন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু বর্ষায় ছয় মাস হাওরে গরু চরানোর কোনো সুযোগ থাকে না। চারদিকে তখন থই থই পানি থাকে। এই সময়টায় ঘরের গরুগুলো গোয়ালেই রাখা হয়। পুরো ছয় মাস ঘরে সংগ্রহ করা খড়ই গরুকে খাওয়াতে হয়। এবার হাওরের কৃষক পরিবারে যাঁদের গরু আছে তাঁরা সবাই কমবেশি সংকটে পড়বেন। আবার অন্য জায়গা থেকে যে খড় কিনবেন সেই সুযোগও ফসলহারা কৃষকদের কম। সেই সামর্থ্যও অনেকের নেই।

সরকারি সহায়তার দাবি

দেখার হাওরপারের আরেক কৃষক আবদুল মুমিন (৪৮) বলছিলেন, ‘শুনছি সরকার যাদের ধানের ক্ষতি অইছে তারারে সাহায্য দিব। গরুর খানির লাগিও যেন সরকার থাকি আমরা সাহায্য পাই, এই ব্যবস্থা করত অইব।’

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জে হাওরের কৃষি ও কৃষকরক্ষা আন্দোলন সংগঠনের সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওরে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষকেরা নানাভাবে সংকটে পড়েন। একদিকে নিজের পরিবার-পরিজনের খাদ্যসংকট, অন্যদিকে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। এমনিতেই সংকটে থাকা কৃষকের অনেকে ঘরের গরু বিক্রি করে আর্থিক সংকট মেটানোর চেষ্টা করেন। আবার গোখাদ্যের কারণে অনেকে কমদামে ঘরের গরু বিক্রি করতে বাধ্য হন। এবারও এমনটা হবে।

জেলায় গবাদিপশুর সংখ্যা ও খড়ের চাহিদা

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে কৃষকসহ খামারিদের কাছে গরু রয়েছে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার ৭৩৭টি, মহিষ ৩৯ হাজার ১১২টি, ছাগল এক লাখ ৪৯ হাজার ১১৮টি ও ভেড়া আছে এক লাখ ৪১ হাজার ৫২২। জেলার গবাদিপশুর জন্য বছরে শুকনো খড়ের চাহিদা সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন ও কাঁচা ঘাসের চাহিদা প্রায় ১৯ লাখ মেট্রিক টন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, এখনো গোখাদ্যের সংকটের বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আবহাওয়া এখন ভালো থাকায় কৃষকেরা ধানের পাশাপাশি খড়ও তোলার চেষ্টা করছেন। যেহেতু হাওরে ধানের ক্ষতি হয়েছে, তাই কৃষকেরা খড় কিছুটা কম পাবেন এটাই স্বাভাবিক। সরকার থেকে যদি গোখাদ্যের জন্য কৃষকদের সহায়তা আসে তাহলে তাঁদের সেই সহায়তা দেওয়া হবে।

বৃষ্টি ও বন্যায় ধানের ক্ষতি

সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির পানি জমে অনেক হাওরে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এতে ক্ষতি হয় ধানের। এরপর ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয় অতিভারী বৃষ্টি, নামে উজানের পাহাড়ি ঢল। এতে জেলার সব হাওরেই কমবেশি বোরো ধানের জমি তলিয়ে যায়। টানা কয়েক দিন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকায় কৃষকেরা হাওরে নামতে পারেননি। পানির কারণে কম্বাইন হারভেস্টারে ধান কাটতে সমস্যা হয়। ছিল তীব্র শ্রমিকসংকট। যে কারণে অনেক কৃষকের চোখের সামনে জমির ধান তলিয়ে যায়। তখন কিছুই করতে পারেননি তাঁরা। এখনো বৃষ্টি আছে, তবে কম। এ কারণে বাকি ধান কাটা-মাড়াই ও শুকানোর কাজে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কিষান-কিষানিদের।