মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে রাজধানীতে জ্বালানি সংকট: বাস-গাড়িতে দীর্ঘ লাইন, যাত্রীদের ভোগান্তি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যদিও সরকারের দাবি, দেশে কোনো সংকট নেই, তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়িগুলোকে তেল নিতে হচ্ছে, সেখানেও চাহিদার পুরোটুকু পাওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিং স্টেশনে তেলের সংকট ও দীর্ঘ লাইন
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে মিনিবাস, বাস, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ সব ধরনের যানবাহন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছে। অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পেই জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। কোথাও তেল নেই, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ থাকায় যানবাহনগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক চালক প্রয়োজনীয় তেল পেতে একাধিক পাম্প ঘুরছেন, যা অতিরিক্ত সময় নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস পরিবহনে জ্বালানি সংগ্রহে সমস্যা
দূরপাল্লার বাস ও গণপরিবহনে জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা সরকার অনেক আগেই তুলে দিলেও এখনো এসব যানবাহন পর্যাপ্ত তেল নিতে পারছে না। রাজধানীর বিভিন্ন বাস কাউন্টার ও টার্মিনাল ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে এক ফিলিং স্টেশন থেকেই পর্যাপ্ত তেল সংগ্রহ করতে পারত প্রতিটি পরিবহন। এখন পাঁচ থেকে ছয়টি পাম্প ঘুরে তা নিতে হচ্ছে, ফলে গাড়ি ছাড়তে বিলম্ব হচ্ছে।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে তিশা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার আহসান হাবিব বলেন, "একটি বাসের জ্বালানি সংগ্রহ করতে এখন পাঁচটি পর্যন্ত ফিলিং স্টেশন ঘুরতে হচ্ছে। ফলে যেসব গাড়িতে আগে থেকে জ্বালানি থাকে সেগুলো আগে ছেড়ে দেওয়া হয়, আর অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের পর গাড়ি ছাড়তে হচ্ছে।"
যাত্রীদের ভোগান্তি ও বিলম্ব
গাড়ি ছাড়তে দেরি হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। সায়েদাবাদে পূর্বাশা পরিবহনের যাত্রী তৌহিদুল জানান, তার যাত্রা প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্ব হয়েছে। কাউন্টার থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলা হলেও পরে অন্য যাত্রীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, মূলত জ্বালানিসংকটের কারণেই এই বিলম্ব হয়েছে।
তিশা পরিবহনের যাত্রী তুহিন বলেন, "প্রথমে তাকে একটি গাড়িতে উঠানো হলেও পরে জ্বালানির স্বল্পতার কারণে সেটি ছাড়তে পারেনি। পরে তাকে অন্য একটি বাসে উঠানো হয়। এতে তার যাত্রা আরো দেরিতে শুরু হয়।"
চালকদের আয়-রোজগার বন্ধ
জ্বালানি সংকটের কারণে রাজধানীর সড়কে গণপরিবহনের চাকা যেন ধীরে ধীরে থমকে যাচ্ছে। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় বাস চালাতে পারছেন না চালকরা। ফলে আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে হাজারো পরিবহন শ্রমিকের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়।
আজিমপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা রুটে চলাচলকারী ‘ভিআইপি’ বাসের চালক মোহাম্মদ মামুন বলেন, "জ্বালানিসংকটে বাস চালাতে পারছেন না তিনি। এতে আয় বন্ধ হওয়ায় পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।"
যাত্রীদের অসহিষ্ণুতা ও কর্মঘণ্টা অপচয়
জ্বালানিসংকটের কারণে মাঝপথে বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। এতে যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও সহকারীদের অহরহ বাগিবতণ্ডার ঘটনা ঘটছে। চালকদের ভাষ্য, রাস্তায় তেল শেষ হয়ে গেলে কোনো পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালেই যাত্রীরা গালিগালাজ শুরু করে।
রাজধানী জুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। এ সংকটে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কোনো নিশ্চয়তা। ফলে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং স্থবির হয়ে পড়ছে নগরজীবনের গতি।



