জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রার খরচে কেমন প্রভাব পড়বে?
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই আপনার খরচের খাতা নিরবে ফুলেফেঁপে উঠবে। জীবনযাত্রার প্রায় প্রতি পদে পদে খরচ বাড়বে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, যাতায়াতের খরচ বাড়বে। এর ফলে মাসের শেষে খরচের খাতার হিসাব মেলাতে গিয়ে বোঝা যায়, এর প্রভাবটা কতটা গভীরে গেছে। ফলে সীমিত ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়ে, পকেটের টাকা দ্রুত ফুরায়।
জ্বালানি তেলের নতুন দাম কত?
সরকার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম গত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।
রোববার থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে দাম বাড়ল ২১২ টাকা। চলতি মাসে এ নিয়ে দুবার দাম বাড়ানো হলো।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
এবার দেখা যাক, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আপনার–আমার সবার জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে।
- যাতায়াতে বাড়তি খরচ: অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রথমেই যাতায়াতের খরচ বাড়বে। বাসভাড়া, উবার-পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন মালিকেরা। শেষে রিকশাভাড়াও বাড়বে। ধরা যাক, আগে অফিসে যাওয়া-আসা করতে দিনে ১০০ টাকা ভাড়া লাগত। তেলের দাম বাড়ার পর সেটি দাঁড়াল ১৩০–১৪০ টাকা, মাসে অতিরিক্ত ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ বাড়বে।
- বাজারে পকেট কাটবে বেশি: জ্বালানি তেলের কারণে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি পাবে। ইতিমধ্যে ট্রাকভাড়া বাড়তে শুরু করেছে। তাই বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে শাকসবজির দাম বাড়তে শুরু করেছে। ডিজেলচালিত সেচেও খরচ বাড়বে। ফলে চালের দামও বাড়তে পারে। এর ফলে বাজার থেকে আগের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে।
- বিদ্যুৎ বিলের চাপ: ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়বে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য বাড়বে। ফলে সরকার ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম বাড়াতে পারে। যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, তাহলে মাস শেষে আপনার খরচ বাড়বে। বেশি বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। যেমন আগে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা বিল এলে তা বেড়ে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় যেতে পারে, যা সংসারের খরচ বাড়াবে।
- বাসাভাড়ার অজুহাত: বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের দাম বাড়লে বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করেন। এতে আপনার খরচ বাড়বে। যেমন ১০ হাজার টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা করার কথা শুনতে হতে পারে ভাড়াটিয়াকে।
- বাইরে খাওয়ার খরচ: প্রতি মাসে পরিবার-পরিজন নিয়ে রেস্টুরেন্ট বা ফাস্টফুডে খেতে যান। এবার কিন্তু সেখানে খরচ বাড়তে পারে। কারণ, এলপিজির দাম বেড়েছে। সাধারণত রেস্টুরেন্টে এলপিজি ব্যবহার করা হয়। তাই খাবারের দাম বাড়িয়ে দেবেন মালিকেরা। এতে আপনার খাবারের বিলও বাড়বে। আগে ১০০ টাকার খাবার এখন ১২০ থেকে ১৩০ টাকা হতে পারে। পরিবার নিয়ে মাসে দুবার খেলে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ।
- ডেলিভারি চার্জ বেড়ে যায়: অনলাইনে খাবার বা পণ্য অর্ডার করলে ডেলিভারি চার্জ ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে যায়। মাসে ৮–১০ বার অর্ডার করলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি যায়। কিন্তু এখন ডেলিভারি চার্জ বাড়তে পারে, কারণ, যাতায়াতের খরচ বাড়ছে।
- সঞ্চয়ে টান পড়ে: সার্বিকভাবে খরচ বেড়ে যাওয়ায় আপনার সঞ্চয়ে টান পড়তে পারে। যেমন আগে মাসে পাঁচ হাজার টাকা সঞ্চয় করতেন। এখন বাড়তি খরচ সামলে হয়তো তা দুই থেকে তিন হাজার টাকায় নেমে আসতে পারে।
- মাস শেষে ঘাটতি: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য কারণে সংসার খরচের চাপ সামাল দিতে মাস শেষে সীমিত ও মধ্যবিত্তের হিমশিম খেতে হয়। ফলে তাঁদের ধারদেনা করে চলতে হয়। আগে যেখানে মাস শেষে দুই থেকে তিন হাজার টাকা হাতে থাকত। এখন সেখানে শূন্য খাতা কিংবা ঋণের খাতায় যুক্ত হয়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু যাতায়াত নয়, বাজার, বিদ্যুৎ, বাসাভাড়া, খাবার ও অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলছে। সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



