চট্টগ্রাম বন্দরে বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করবে এমজিএইচ গ্রুপ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি এমজিএইচ গ্রুপ দেশে প্রথম বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পথে এগিয়ে চলেছে। আজ সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
টার্মিনাল নির্মাণের বিস্তারিত পরিকল্পনা
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে বন্দর থেকে ইজারা নেওয়া সাত একর জমিতে এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এমজিএইচ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস ২০ বছরের জন্য জমিটি ইজারা নিয়েছে। টার্মিনালে ২৫০ মিটারের একটি জেটি থাকবে, যা একটি কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করবে।
এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদ জানান, টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল অনুমোদন ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ৫৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।
টার্মিনালের কার্যকারিতা ও সুবিধাসমূহ
প্রস্তাবিত টার্মিনালটির মাসিক ৪০ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা থাকবে। এতে অন্তত ১৮০ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। টার্মিনালের একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো এর অবস্থান; এটি সাগরের সবচেয়ে কাছাকাছি হওয়ায় অন্য টার্মিনালের তুলনায় কম সময়ে জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।
মোহনা থেকে মাত্র ২.৬০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত এই টার্মিনালে জাহাজ আনা-নেওয়ায় প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগবে। এমজিএইচ গ্রুপের দাবি, সাগরের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে প্রতিবার জাহাজ ভেড়ানোর ক্ষেত্রে ০.৬ থেকে ১.৩ টন জ্বালানি সাশ্রয় হবে, যা শিপিং লাইনগুলোর অপারেশনাল খরচ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করবে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা
জমির আয়তন সীমিত হলেও টার্মিনালের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইয়ার্ডে একসঙ্গে প্রায় ৩,৫০০ একক কনটেইনার রাখার ব্যবস্থা থাকবে। দ্রুত কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য তিনটি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করা হবে।
টার্মিনালটিকে পরিবেশবান্ধব 'সবুজ টার্মিনাল' হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কনটেইনার ওঠানো-নামানো ও স্থানান্তর কাজে ব্যবহৃত যানবাহন সম্পূর্ণরূপে বৈদ্যুতিক হবে। সোলার রুফটপ, সোলার রোড প্যানেল এবং বিশেষায়িত সৌর অবকাঠামো স্থাপনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২,৭০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রতিযোগিতা
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে: জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনাল। বাংলাদেশের কনটেইনারে আমদানি-রপ্তানির ৯৯ শতাংশই এই চারটি টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
এমজিএইচ গ্রুপের টার্মিনাল নির্মাণের ঘোষণার আগেই পতেঙ্গায় লালদিয়ার চরে ডেনমার্কের এপি মোলার মায়ের্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের নতুন একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে বন্দরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, তারা তিন বছরে টার্মিনাল নির্মাণ করে ৩০ বছর পরিচালনা করবে এবং আয় বন্দরের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে।
এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবসায়িক প্রোফাইল
১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এমজিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ গাজীউল হকের পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাস আরও পুরোনো। তিনি ১৯৮৫ সালে ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মায়ের্সক লাইনের বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর সময় অংশীদার ছিলেন। বর্তমানে গ্রুপটির বিশ্বের ২৭টি দেশে ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে।
গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পোর্টলিংক লজিস্টিকস সেন্টার ২০০৩ সাল থেকে আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রয়েছে। এই বেসরকারি ডিপো বছরে দেড় লাখের বেশি কনটেইনার ব্যবস্থাপনা করে থাকে। শিপিং ও লজিস্টিকস খাতের পাশাপাশি গ্রুপটির ব্যাংকিং, পরিবহন ও কুরিয়ার সেবা, খাদ্য ও পানীয়, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে। গ্রুপটিতে সাড়ে তিন হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বক্তব্য
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, 'এমজিএইচ টার্মিনালের চুক্তি স্বাক্ষর আমাদের মেরিটাইম শিল্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই টার্মিনাল জাহাজ ঘোরার সময় এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, যা বিশ্ববাজারে আমাদের রপ্তানিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।'
৭ একর জমি বছরে ১৫ কোটি টাকায় ভাড়া নেওয়ার এই চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। টার্মিনালটি চালু হলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।



