কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে স্কুলছাত্র ইথান আহমেদ (১২) গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। শিশুটির বাবা ইউনুস মিয়া বাদী হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি করেন।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার শ্রাবণ (২২) শিক্ষার্থীকে গুলির সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন। তবে তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; মামলার এজাহারে তাঁর নাম নেই। মামলাটিতে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিস্তারিত ও গ্রেপ্তার
আজ শুক্রবার সকালে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে মামলার আসামিদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। ওসি বলেছেন, মামলার আসামিদের অধিকাংশই কাটাবিল এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি। গ্রেপ্তার শ্রাবণও একই এলাকার বাসিন্দা।
মামলার বাদী ও গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী ইথান আহমেদের বাবা ইউনুছ মিয়া কুমিল্লা নগর উদ্যানে (শিশুপার্কে) একটি রাইড পরিচালনা করেন। আজ সকালে তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের গুলি আমার ছেলের পিঠ দিয়ে শরীরের ভেতর ঢুকে গেছে। আমার ছেলেটা তো কোনো অন্যায় করেনি, তাহলে কেন তাকে গুলি করা হলো? আমি এই সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বিচার চাই। প্রশাসন কঠোর না হলে মাদক কারবারিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।’
ইথানের মা সোনিয়া আক্তার বলেন, ‘কাটাবিল এলাকার অপু ও সাব্বির—এ দুই পক্ষের মধ্যে মাদক নিয়ে কয়েক দিন ধরেই বিরোধ চলছিল। গতকাল আমি আমার একমাত্র ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েছিলাম। টিফিনের সময় খাবার খেতে বের হলে তার পিঠে গুলি লাগে। আমার একমাত্র ছেলেটার কিছু হলে আমি কী নিয়ে বাঁচব?’
পুলিশের অভিযান ও আহতের অবস্থা
ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ঘটনার পর থেকেই পুলিশ জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তবে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিরা এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে। তাদের ধরতে পুলিশ ও ডিবির একাধিক টিম কাজ করছে। ঘটনাস্থলে থাকা শ্রাবণ নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে আজ আদালতে তোলা হবে। মামলার আসামিদের প্রায় সবাই মাদক কারবারি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাটাবিল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েকটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। গত বুধবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় গতকাল দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যানারে মাদকবিরোধী মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচি শেষে একদল অস্ত্রধারী ব্যক্তি সেখানে হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। গুলিবিদ্ধ ইথান আহমেদ কাটাবিল রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও একই এলাকার ইউনুস মিয়ার ছেলে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে সে সেখানে চিকিৎসাধীন।
চিকিৎসা ও আইনশৃঙ্খলা বৈঠক
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, শিক্ষার্থীর পিঠে বিদ্ধ হওয়া গুলি ফুসফুসেও আঘাত করেছে। হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।
এদিকে গতকাল রাতে নগরের কাটাবিল এলাকায় ইথানের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তিনি মাদক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কোতোয়ালি থানার ওসির উদ্দেশে বলেন, ‘এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা থাকবে, একজন স্কুলছাত্র স্কুলে যেতে পারবে না, তারপর আপনি ওসি থাকবেন, আমি এমপি থাকব—এটা ঠিক নয়।’
মনিরুল হক চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমরা সবাই তাদের (মাদক ব্যবসায়ীদের) কাছে আত্মসমর্পণ করে চলে যাই, আর না হয় কিছু একটা করেন। দিনদুপুরে যা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হয়।’
পরে রাতে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সংসদ সদস্য। সেখানে তিনি বলেন, ‘এভাবে একটি শহর চলতে পারে না। চারদিকে মাদকের বিস্তার। মাদকের প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হবে—এটা সীমা অতিক্রম করেছে।’ তিনি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হবে।



