অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকারি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য চারটি মূল মানদণ্ড পূরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এগুলো হলো—অর্থের সঠিক ব্যবহার, বিনিয়োগে প্রত্যাবর্তন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব।
করদাতার অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কঠোর শর্ত
মন্ত্রী বলেন, সরকারি অর্থ মূলত করদাতাদের টাকা, তাই প্রতিটি প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, পরিমাপযোগ্য ফলাফল এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কঠোর মানদণ্ড প্রবর্তন করেছে।
অতীতের দুর্নীতি ও অপচয়ের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পদক্ষেপ
অতীতের দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের অপচয়ের কথা উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখন থেকে যেকোনো নতুন প্রকল্প চারটি মূল মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে: মূল্যের বিপরীতে সুবিধা, বিনিয়োগে প্রত্যাবর্তন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত প্রভাব। তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের অধীনে থাকা প্রায় ১,৩০০ প্রকল্পের অনেকগুলোরই অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বা পরিবেশগত বিবেচনা নেই এবং সেগুলো বাতিল করা হচ্ছে।
“যে কোনো ভবিষ্যৎ প্রকল্প যদি এই মানদণ্ড পূরণ না করে, তা অনুমোদিত হবে না। এটা এতটাই সহজ,”—বলেন তিনি।
ঢাকায় পিকেএসএফ ভবনে অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর বক্তব্য
মন্ত্রী ঢাকার আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফ ভবনে “রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (রেইজ)” প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল “স্টেপিং ফরোয়ার্ড: দ্য ইনঅগুরেশন অব রেইজ-২”। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জনগণের জানার অধিকার ও প্রকল্পের যৌক্তিকতা
মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সরকারি প্রকল্পের পেছনের যুক্তি এবং প্রত্যাশিত সুবিধা সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। “আমরা একা প্রকল্পের উদ্দেশ্য বুঝলেই যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষকেও এই উদ্যোগের চিন্তাভাবনা জানতে হবে,”—যোগ করেন তিনি।
অলিগার্কিক ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতির সমালোচনা
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বছরের পর বছর ধরে সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বাদ দিয়ে আসা অলিগার্কিক ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এর ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে এবং বাড়তে থাকছে।” সরকার মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের আহ্বান
স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটাতে চায়। “বাংলাদেশে পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের হার আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি। এটি লজ্জাজনক,”—বলেন তিনি। আসন্ন জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হবে বলে জানান মন্ত্রী।
সৃজনশীল অর্থনীতির স্বীকৃতির প্রয়োজন
মন্ত্রী “সৃজনশীল অর্থনীতি”র অধিকতর স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংস্কৃতি, সংগীত ও ক্রীড়ার মতো খাত জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
রেইজ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত রেইজ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো দক্ষতা প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বে অতিরিক্ত দুই লাখ তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা দক্ষতা উন্নয়ন ও আর্থিক সহায়তা পাবেন। এছাড়া, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়াতে ১,৬০০ নারীকে গৃহভিত্তিক শিশু যত্ন উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে আসে, যা দেশের জিডিপিতে ৩০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। পিকেএসএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের জানান, প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে ১৩টি কর্মসূচির অধীনে দেশব্যাপী ১৫ হাজার শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৭৩ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী নিজ নিজ খাতে কর্মসংস্থান পেয়েছেন।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় পরিচালক গেইল এইচ মার্টিন বলেন, বাংলাদেশের বছরে প্রায় ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান প্রয়োজন, অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় ৯ লাখে সীমাবদ্ধ রয়েছে। “কর্মসংস্থান দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পথ,”—বলেন তিনি।
দ্বিতীয় পর্বে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তরুণদের অগ্রাধিকার
কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বে চর, হাওর, পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, পাশাপাশি দলিত সম্প্রদায়, জাতিগত সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দেওয়া হবে।



