জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে দেশে বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাণিজ্যঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামালের উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে বাণিজ্যঘাটতি বেড়েছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে বাণিজ্যমন্ত্রী
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাণিজ্যঘাটতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্যঘাটতি ২৬৬ কোটি বা ২.৬৬ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাণিজ্যঘাটতি ছিল ১৬.২৪ বিলিয়ন ডলার, যা সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়।
সার্কভুক্ত দেশের সঙ্গে বাণিজ্য
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আমদানি ও রপ্তানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী সার্কভুক্ত দেশ ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে ঘাটতি ৭৮৬ কোটি ডলার, পাকিস্তানের সঙ্গে ৬৮ কোটি, ভুটানের সঙ্গে প্রায় ৩ কোটি এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে ১ কোটি ডলার। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে।
রপ্তানি নির্ভরতা ও বন্ড সুবিধা
নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের রপ্তানি বাণিজ্য তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল এবং রপ্তানি আয়ের ৮৪ ভাগ এই খাত থেকে অর্জিত হয়। এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত, কৃষিজ পণ্য, ওষুধশিল্প, আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের আংশিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক নিশ্চয়তার বিনিময়ে বন্ডের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি পণ্যের তালিকা
চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত রপ্তানিকৃত খাদ্যপণ্যগুলো হলো চা, শাকসবজি, ফলমূল, পানপাতা, তেলবীজ, চিনি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ভোজ্যতেল, বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয় এবং সাদা ও হিমায়িত মাছ। জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২০২ দেশে পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
চামড়া খাতের চ্যালেঞ্জ
দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি তিন বছর ধরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ঘরে আটকে আছে বলে সংসদে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া যায়নি। এতে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা কমেছে এবং খাতটির সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন কোরবানির চামড়ার বাজার, নির্ধারিত দাম এবং সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মুক্তাদির বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, তা লবণযুক্ত সংরক্ষিত চামড়ার দাম। চামড়ার গুণগত মান, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং পশুর ধরনভেদে বাজারমূল্য ভিন্ন হয়। পশুর গা থেকে চামড়া খুলে নেওয়ার সময় দক্ষতার সঙ্গে করলে সেটির মূল্যও আলাদা হয়। মন্ত্রী বলেন, এ বছর কোরবানির পশুর সংখ্যা নিয়ে সরকারের কাছে যে তথ্য এসেছে, তাতে প্রায় এক কোটি এক লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে।
অর্থ পাচার প্রসঙ্গে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সদস্য রুমিন ফারহানা সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, আমদানি ও রপ্তানির আড়ালে প্রতিবছর প্রায় আট বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এটি ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ আছে কি না। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং গবেষণাভিত্তিক। এটি একটি 'পারসিভড অ্যামাউন্ট'। এটি শুনতে বা বলতে যত সহজ, বাস্তবে তত সহজ নয়।



