বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বড় অভিযোগ ছিল ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার জটিলতা। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা নতুন বিনিয়োগ করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের একাধিক লাইসেন্স, অনুমোদন, কর-সংক্রান্ত জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বছরের পর বছর। ফলে ব্যবসার প্রকৃত ব্যয়ের পাশাপাশি বেড়েছে অদৃশ্য খরচ, সময় অপচয় এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সেই চিত্র পাল্টানোর বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহজীকরণকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাজেটে ডি-রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণের মাধ্যমে লাইসেন্স, অনুমোদন, কর প্রশাসন, বিনিয়োগ সেবা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একগুচ্ছ সংস্কার ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবসা-বান্ধব সংস্কার প্যাকেজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সাত দিনের মধ্যে মিলবে প্রাথমিক অনুমোদন
বর্তমানে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন পেতে কয়েক মাস থেকে অনেক ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। নতুন ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীরা আবেদন করার সাত দিনের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা প্রভিশনাল অনুমোদন পাবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হলে সেই লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। আন্তর্জাতিকভাবে ‘ডিমড অ্যাপ্রুভাল’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স
দেশের ব্যবসায়ীদের অন্যতম অভিযোগ হলো—প্রতি বছর বিভিন্ন লাইসেন্স ও পারমিট নবায়নের ঝামেলা। নতুন বাজেটে প্রায় সব ধরনের লাইসেন্স ও অনুমতির মেয়াদ পাঁচ বছর করার প্রস্তাব আসছে। এর ফলে উদ্যোক্তাদের সময় ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে। একইসঙ্গে সরকারি দপ্তরগুলোর প্রশাসনিক চাপও কমবে।
‘এক দরজায়’ সব সেবা
বর্তমানে একটি কারখানা স্থাপন করতে বিডা, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, কর কর্তৃপক্ষসহ বহু সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হয়। এই জটিলতা দূর করতে চালু করা হচ্ছে—সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাবিজ’। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী এক জায়গায় আবেদন করেই প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন কমিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
কর ব্যবস্থায় বড় ডিজিটাল রূপান্তর
বাজেটে কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ অনলাইন করপোরেট ট্যাক্স রিটার্ন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে। একইসঙ্গে করদাতাদের জন্য মোবাইল অ্যাপ চালু করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে, আগেভাগে রিটার্ন দিলে প্রণোদনা পাওয়া যাবে, দেরিতে রিটার্ন দিলে অতিরিক্ত কর দিতে হবে, কর রিফান্ড সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হবে এবং কাস্টমস ও আয়কর তথ্য একীভূত করা হবে। অটোমেশনের মাধ্যমে হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতাও কমবে।
১৯ খাতে কমছে অগ্রিম কর ও উৎসে কর
ব্যবসার কার্যকর করহার কমানোর লক্ষ্যে অন্তত ১৯টি খাতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পের কাঁচামাল, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, মোবাইল ফোন শিল্প, রপ্তানি খাত, প্যাকেজিং শিল্প, পরিবহন ও লজিস্টিকস, মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা, রিসাইক্লিং শিল্প, স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার ব্যবসা, অফশোর ঋণ এবং বিদেশি বিমা প্রিমিয়াম। অর্থনীতিবিদদের মতে, কার্যকর করহার কমানো গেলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয় কমবে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুবিধা
দেশে প্রায় ৫০ হাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ী থাকলেও উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। তাদের করজালের আওতায় আনতে টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে স্বর্ণ বিক্রিতে ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স আরোপের চিন্তাভাবনাও চলছে। সরকারের আশা, করহার কমলে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত আয় প্রকাশে আরও উৎসাহিত হবেন।
তরুণ, নারী ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা
বাজেটে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একাধিক কর সুবিধা রাখা হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের পূর্ণ কর অব্যাহতি, এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত টার্নওভার, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা এবং স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৯ বছরের কর অবকাশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগে অতিরিক্ত কর সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় প্রণোদনা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) খাতে ব্যাপক কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সুবিধার মধ্যে রয়েছে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির শুল্ক কমানো, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর অব্যাহতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কর সুবিধা, বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে কর হ্রাস এবং চার্জিং স্টেশন স্থাপনে কর ছাড়। সরকারের বিশ্বাস, এসব পদক্ষেপ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখবে।
কর বিরোধ নিষ্পত্তিতে দ্রুত সমাধান
ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল কর-সংক্রান্ত মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এবার আপিল, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে করদাতা ও সরকারের উভয়ের জন্যই রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন বার্তা
বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশার তুলনায় কম। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বিশেষ করে প্রশাসনিক জটিলতা, লাইসেন্স প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং কর প্রশাসনের অনিশ্চয়তাকে বড় বাধা হিসেবে দেখেন। নতুন বাজেটের ডি-রেগুলেশন কর্মসূচি, ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন ব্যবস্থা, কর রিফান্ড অটোমেশন এবং করহার হ্রাসের উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
যদিও বাজেটে ঘোষিত সংস্কারগুলো ব্যবসায়ী সমাজের কাছে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নীতিগত সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে কার্যকর না হলে কাগজে-কলমে থাকা সুবিধাগুলো বিনিয়োগ পরিবেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের বাজেট?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অনেকেই ‘বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের বাজেট’ হিসেবে দেখছেন। লাইসেন্স ও অনুমোদন সহজীকরণ, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, অগ্রিম কর কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর ছাড়, স্টার্টআপ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা—সব মিলিয়ে সরকার ব্যবসার খরচ কমিয়ে অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের গতি ফেরানোর চেষ্টা করছে।
সংস্কারগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশই উন্নত করবে না, বরং কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, রফতানি এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে।



