দেশের ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্য ও ব্যবসা ত্বরান্বিতকরণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত এই উদ্যোগের আওতায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে কার্যকরী মূলধন ঋণ পাবেন।
নতুন তহবিলের নাম ও মেয়াদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ সোমবার এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী জারি করা এই নির্দেশনা দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই নতুন তহবিলের নাম ‘সিএমএসএমই সেক্টর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল রিফাইন্যান্সিং ফান্ড’। প্রাথমিকভাবে তহবিলের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট ও প্রণোদনা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানই পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধনের অভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন, সেবা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, এই বাস্তবতা বিবেচনা করেই তহবিলটি গঠন করা হয়েছে।
সুদের হার ও শর্ত
নতুন তহবিলের আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ পাবে। এরপর তারা উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। ব্যাংকগুলোকে প্রতি তিন মাস পরপর বাংলাদেশ ব্যাংকে সুদ পরিশোধ করতে হবে। প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এবং সাধারণ ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডোগুলোও নিজস্ব নীতি অনুসরণ করে বিনিয়োগ আকারে এই সুবিধা দিতে পারবে।
ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কার্যকরী মূলধন সংকটের কারণে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন বা ব্যবসা পরিচালনা করতে অক্ষম সক্রিয় কুটির, মাইক্রো, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলো এই তহবিলের আওতায় ঋণের জন্য যোগ্য হবে। এছাড়া যেসব উদ্যোক্তা বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কোনো পুনঃঅর্থায়ন বা প্রি-ফাইন্যান্সিং স্কিমের আওতায় কার্যকরী মূলধন ঋণ নিচ্ছেন, তাদের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনা করে এই তহবিল থেকেও নতুন ঋণ নিতে পারবেন। তবে খেলাপি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এই তহবিলের আওতায় কোনো ঋণ সুবিধা পাবে না।
গ্রেস পিরিয়ড ও ফি
উদ্যোক্তাদের ব্যবসা গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে ঋণের জন্য ৩ থেকে ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ড নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ঋণ নেওয়ার পর প্রথম তিন থেকে ছয় মাস কোনো কিস্তি দিতে হবে না। এছাড়া ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত চার্জের বাইরে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত ফি, কমিশন বা সার্ভিস চার্জ আদায় করতে পারবে না।
ঝুঁকি ও জামানত
গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণকৃত ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ ঝুঁকি ও দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। ঋণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী জামানত বা সহ-জামানত গ্রহণ করতে পারবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এই তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে যেসব ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) ৭০ শতাংশের বেশি, তারা তহবিল বরাদ্দে অগ্রাধিকার পাবে। তবে কোনো ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সর্বোচ্চ এডিআর সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।
তদারকি
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, তহবিলটি সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রয়োজনে ঋণ অনুমোদনের আগে বা পরে যেকোনো নথি চাওয়া হবে। এছাড়া অন-সাইট পরিদর্শন ও নিরীক্ষার মাধ্যমে ঋণের অর্থ নির্দিষ্ট খাতে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা যাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।



