শুরুর গল্প: দুই বান্ধবীর অদম্য ইচ্ছা
১৯৮৮ সাল। দুই কিশোরীর হাতে আসে একটি জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্নপত্র। সেখানে মোট ছয়টি প্রশ্নের সমাধান করতে হয়। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ছাত্রদের গণিতের দক্ষতা যাচাই করা হতো। তবে সেবার অলিম্পিয়াডে শুধু ছাত্ররাই অংশগ্রহণ করত, তাই মেয়েদের জন্য এটি ছিল অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এই দুই কিশোরীর দৃঢ় ইচ্ছা ছিল, তারা অন্তত একটি প্রশ্নের সমাধান করবে। দুজন সবে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে, তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব, বাড়িও পাশাপাশি। তারা মিলে প্রশ্নগুলো সমাধানের চেষ্টা শুরু করে। টানা দুই দিন কঠোর পরিশ্রম শেষে তারা তিনটি প্রশ্নের সমাধান করতে সক্ষম হয়। খুশিতে দুই বন্ধু আত্মহারা। পরদিন তারা স্কুলের অধ্যক্ষ মিসেস হেরিজাদেহের কাছে সমাধান দেখায় এবং আবদার করে, যেন তাদের ছেলেদের মতো অলিম্পিয়াড প্রশিক্ষণ ক্লাসে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। অধ্যক্ষ তাদের কথা শুনে অত্যন্ত খুশি হন এবং তাদের জন্য ক্লাসের ব্যবস্থা করে দেন।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে সাফল্য
জুলাই ১৯৯৪। হংকংয়ে অনুষ্ঠিত হয় ৩৫তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড। সেবছর ইরানের জাতীয় দলে জায়গা পান দুই বান্ধবী। অলিম্পিয়াডের মোট পয়েন্ট ছিল ৪২। একজন পান ৪২-এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১, ফলে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। ইরানের হয়ে প্রথম কোনো নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক জয় করেন তিনি। সেই নারীর নাম মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর বান্ধবী রয়া বেহেস্তি পান ৩৫ পয়েন্ট এবং রৌপ্যপদক অর্জন করেন। পরের বছর মির্জাখানি কানাডায় অনুষ্ঠিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে ৪২-এ ৪২ পেয়ে পুনরায় স্বর্ণপদক লাভ করেন। মরিয়মের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেহেস্তির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব অটুট ছিল। বেহেস্তি বর্তমানে আমেরিকার ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
মরিয়ম মির্জাখানি ১৯৭৭ সালের ১২ মে ইরানের তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আহমেদ মির্জাখানি একজন তড়িৎ প্রকৌশলী এবং মা জাহরা হাঘিঘি। তাঁরা তিন ভাইবোন। বাবা সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন এবং গণিত শিক্ষা দিতেন, ফলে শৈশবেই মরিয়মের গণিত পাঠ শুরু হয়। গল্পের বই পড়তেও ভালোবাসতেন তিনি। আট বছর বয়সে একটি গল্পও লিখেছিলেন, যেখানে একটি মেয়ে এমন যন্ত্র আবিষ্কার করে যা দিয়ে বিশ্ব ঘুরে দেখা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি তেহরানের ফারজানেগান বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একবার গণিতে কম নম্বর পাওয়ায় শিক্ষক তাঁকে বলেন, গণিতে তাঁর ভালো করার সম্ভাবনা কম। কিন্তু বছর শেষে নতুন গণিত শিক্ষক এসে তাঁর আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত করেন। মরিয়ম প্রায়ই পুরোনো বইয়ের দোকানে যেতেন, কম টাকায় পুরোনো বই কিনে বিচিত্র বিষয় পড়তেন। একদিন তাঁর বিশ্বাস হয়, তিনি লেখক হবেন এবং তাঁর বই সারা বিশ্ব পড়বে। টেলিভিশনে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও গণিতবিদের জীবনী দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন, বিশেষ করে মেরি কুরি ও হেলেন কেলারের জীবনী।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা
১৯৯৫ সালে মির্জাখানি বৃত্তি পেয়ে শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে গণিত নিয়ে পড়তে শুরু করেন। একই বছর ই এস মাহামুদিয়ানের সঙ্গে যৌথভাবে গণিতের ওপর একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালে ব্যক্তিগতভাবে আরও দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, যেখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন ফিল্ডস পদকপ্রাপ্ত গণিতবিদ কার্টিস ম্যাকমুলেন। ম্যাকমুলেন অধিবৃত্তিক জ্যামিতি পড়াতেন, যা মরিয়ম প্রথমে বুঝতে না পারলেও বিষয়টি তাঁর ভালো লাগে। ২০০৩ সালে হার্ভার্ড তাঁকে মেরিট ফেলোশিপ প্রদান করে। ২০০৪ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন, যার জন্য তিনি ১৩০ পৃষ্ঠার একটি থিসিস জমা দেন, যার বিষয় ছিল অধিবৃত্তিক জ্যামিতি ও জিওডেসিক।
জিওডেসিক একধরনের জ্যামিতি যা বক্রতলে আঁকা হয়। সাধারণ জ্যামিতি সমতলে বা দ্বিমাত্রিক তলে আঁকা হয়, কিন্তু জিওডেসিক ত্রিমাত্রিক কাঠামোতে কাজ করে। এই জ্যামিতিতে সরলরেখাকে বক্ররেখার মতো মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সরলরেখা। দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে কম দূরত্বই সরলরেখা, তবে বক্রতলে তা বাঁকানো দেখায়। পৃথিবীর কাল্পনিক রেখাগুলো এর উদাহরণ, যেগুলো সরলরেখা হলেও বাঁকানো মনে হয়।
কর্মজীবন ও ফিল্ডস পদক
২০০৪ সালে মির্জাখানি হার্ভার্ড জুনিয়র ফেলোশিপের প্রস্তাব পান, কিন্তু আরও ভালো পদের আশায় তা গ্রহণ করেননি। একই বছর তিনি ক্লে রিসার্চ ফেলোশিপ লাভ করেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তিনি জ্যামিতি বিষয়ে আরও পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ২০০৮ সালে ফেলোশিপ শেষ হলে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তাঁর দেখা হয় কম্পিউটারবিজ্ঞানী জন ভনড্রেকের সঙ্গে, যিনি ২০০৬-২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রিন্সটনে পোস্টডক্টরাল পদে ছিলেন। দুজনের বিয়ে হয়।
২০১৪ সালে মির্জাখানি প্রথম নারী হিসেবে ফিল্ডস পদক লাভ করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়নের সভায় তাঁকে গণিতের নোবেলখ্যাত এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। বক্রপৃষ্ঠের প্রতিসাম্যতা নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি এই পদক পান।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০১৩ সালে মরিয়মের স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে, যা পরে লিভার ও হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের ১৪ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাসপাতালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি পৃথিবীকে দিয়েছেন অনেক কিছু, গণিতকে করেছেন উজ্জ্বল এবং হাজার হাজার নারীকে করেছেন উৎসাহিত। মরিয়ম মির্জাখানি ছিলেন গণিতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই মে মাসে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে এই মহীয়সী গণিতবিদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।



