লুইস দিয়াজ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে একটি গোল করেছেন, আরেকটি করিয়েছেন। তবে সবুজ মাঠের বাইরে লুইস দিয়াজের এমন এক গল্পও আছে, যেটা প্রেরণা দেবে জীবনযুদ্ধে লড়তে থাকা অনেক শিশু-কিশোরকে।
শৈশব ও পরিবার
বারাঙ্কাস। কলম্বিয়ার উত্তর-পূর্ব কোণে লা গুয়াহিরা প্রদেশের ছোট্ট শহর। বারাঙ্কাসের উপকণ্ঠে এক গ্রামে জন্ম দিয়াজের। শুষ্ক, ধুলাময় লা গুয়াহিরাকে বলা হয় কলম্বিয়ার সবচেয়ে অনুন্নত অঞ্চলগুলোর একটি। বৃষ্টি সেখানে আসে কালেভদ্রে। এই অঞ্চলেই বাস করে লাতিন আমেরিকার বিরল আদিবাসী সম্প্রদায় ওয়াইয়ু।
দিয়াজ এসেছেন এমন এক পরিবার থেকে, যাদের দিনটা ভালো গেলেই কেবল দুই বেলা খাবার জুটত, এই অঞ্চলে অবশ্য সেটিই ছিল স্বাভাবিক। অপুষ্টিতে ভোগা দিয়াজ শৈশবে এমনই তালপাতার সেপাই ছিলেন যে কোচরা বলতেন, এই ছেলেকে দিয়ে ফুটবল হবে না।
বাবা লুইস মানুয়েল দিয়াজ ছিলেন নির্মাণশ্রমিক। নিজের পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু ফুটবলটা ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। গড়ে তুলেছিলেন ‘ক্লাব বায়ের দে বারাঙ্কাস’ নামে একটি ফুটবল স্কুল, যেখানে আজও প্রশিক্ষণ পায় লা গুয়াহিরার শিশুরা। দিয়াজেরও ফুটবলের হাতেখড়ি সেখানে। আর মা সিলেনিস মারুলান্দা কী করেছেন? ছেলের প্রথম ফুটবল বুট কেনার টাকা ছিল না বলে নিজের গয়না বিক্রি করে দিয়েছিলেন তিনি।
ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা
ছেলেবেলায় টিভি ছিল না দিয়াজদের ঘরে। সন্ধ্যায় গল্প শোনাতেন দাদা-দাদিরা। ছয় বছর বয়স থেকেই বারাঙ্কাসের ধুলামাখা রাস্তায় খালি পায়ে বল নিয়ে দৌড়াত ছোট্ট দিয়াজ। প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন রোনালদিনহো। টিভিতে এই ব্রাজিলিয়ানের কোনো ম্যাচ দেখলেই বাড়ির সামনের মাঠে একা একা সেই মুভ অনুকরণ করার চেষ্টা করতেন দিয়াজ।
প্রথম সুযোগ
২০১৫ সাল। কলম্বিয়ার ক্যারিবিয়ান উপকূলের তিনটি শীর্ষ ক্লাবের একটি আতলেতিকো জুনিয়র বারানকুইয়া শহরে আয়োজন করেছিল উন্মুক্ত ট্রায়াল। বারাঙ্কাস থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে সেই ট্রায়ালে যোগ দিয়েছিলেন দিয়াজ। তিন হাজারের বেশি কিশোরের ভিড়ে একজন রোগাটে, অপুষ্ট দিয়াজকে আলাদা করে চেনা সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু ছাই কি রত্নকে ঢেকে রাখতে পারে?
পরবর্তী সময়ে জুনিয়রের মূল দলে জায়গা পাওয়ার আগে দিয়াজকে যেতে হয়েছিল বারাঙ্কিয়া এফসি নামের একটি সহযোগী দলে। এখানেই বদলে যায় তাঁর শরীর। পুষ্টিকর খাবার আর নিয়মিত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পেশি, খেলায় আসে পরিপূর্ণতা। দিয়াজ যখন ১৭ বছর বয়সে বারাঙ্কিয়া এফসির যুব দলে যোগ দেন, তাঁর মা সিলেনিস তখন পুরো দলের জন্য রান্না করতেন। আর খেলোয়াড়েরা ভালোবেসে তাঁকে ডাকতেন ‘মামা দিয়াজ।’
এরপর জায়গা পেয়ে যান আতলেতিকোর মূল দলে। ২০১৯ সালে পোর্তোর হয়ে প্রথম ইউরোপে পাড়ি জমান। ২০২২ সালে যোগ দেন লিভারপুলে, প্রথম কলম্বিয়ান হিসেবে অলরেড জার্সিতে। সেখানে আলো ছড়ানোর পর চলে আসেন বায়ার্নে। এর মধ্যে ঘটে যায় আরেক কাহিনি।
পরিবারের বিপদ
২০২৩ সালের অক্টোবর। বারাঙ্কাসে একদল সশস্ত্র গোষ্ঠী দিয়াজের বাবা-মা দুজনকেই অপহরণ করে। মা সিলেসিনকে পুলিশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করলেও বাবা লুইস মানুয়েল দিয়াজ থেকে যান নিখোঁজ। মুক্তিপণের দাবিতে তাঁকে বন্দী করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। দিয়াজ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন বাবাকে মুক্ত করার জন্য। প্রায় দুই সপ্তাহ বন্দী থাকার পর মুক্তি পান লুইস মানুয়েল দিয়াজ।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
দিয়াজ এখন বিশ্ব ফুটবলের বড় তারা। কিন্তু এখনো নিয়মিত ফেরেন বারাঙ্কাসে, এখনো রাস্তায় ফুটবল খেলেন স্থানীয় ছেলেদের সঙ্গে। নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘লুইস দিয়াজ ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন নিজের শহরের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দিকে।



