কাতারের জালে কানাডার গোলবন্যার শুরুটা করেন কাইল লারিন। গোলের পর তাঁর উদ্যাপন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে কানাডা ২৮তম, কাতার ৫৮তম। তার ওপর ম্যাচটি ছিল কানাডার ঘরের মাঠ ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে। খেলা শুরুর বাঁশি বাজার আগেই এ ম্যাচের ফল অনেকে আন্দাজ করে নিয়েছিলেন।
সেই আন্দাজ মতোই ঘুরেছে স্কোরবোর্ডে গোলের চাকা। কেউ কেউ রসিকতা করে বলতে পারেন, কানাডা বেশি গোল করে ফেলেছে! কাতার সমর্থকেরাও অনুযোগ করতে পারেন, দলের কাছ থেকে আরেকটু ভালো পারফরম্যান্সের আশা ছিল তাঁদের। তবে কেউ–ই হয়তো আশা করেননি, বিশ্বকাপের এ ম্যাচে কারও পা ভাঙবে!
কিন্তু কানাডার ৬–০ গোলের বড় জয়ের পাশাপাশি ঘটেছে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও। ৫২ মিনিটে কানাডা মিডফিল্ডার ইসমায়েল কোনের কাছ থেকে বল কাড়তে গিয়ে পেছন থেকে মারাত্মক ট্যাকল করেন কাতারের মিডফিল্ডার আসিম মাদিবো। পড়ে গিয়ে কাতরাতে থাকা কোনের বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ ভেঙে ঝুলতে দেখা যায়। মাঠেই কিছুক্ষণ তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর স্ট্রেচারে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন কোনেকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন কানাডা কোচ জেসে মার্চ।
মারাত্মক এ ফাউল করে প্রথমে হলুদ কার্ড দেখেছিলেন মাদিবো। ভিএআরের হস্তক্ষেপে পরে তাঁকে লাল কার্ড দেখানো হয়। তবে মাদিবোকেও অনুশোচনায় ভুগতে দেখা যায় মাঠে। সতীর্থরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রায় সাড়ে ছয় মিনিট বন্ধ ছিল খেলা। কাতার ততক্ষণে পরিণত হয় ৯ জনের দলে। স্কোরবোর্ডে পিছিয়ে ৩–০ গোলে। মধ্যপ্রাচ্যের দলটির ম্যাচে ফেরার আশা ততক্ষণে প্রায় শেষ।
তারপর যেটা ঘটার সেটাই ঘটেছে। কাতারের দুজন খেলোয়াড় কম থাকার সুযোগে কানাডা আরও তিন গোল করেছে। কোনের বদলি নামা মিডফিল্ডার নাথান সালিবা ৬৪ মিনিটে ফ্রি–কিক থেকে গোল করে তাঁর সতীর্থের জার্সি উঁচিয়ে ধরেন স্বাগতিক দর্শকদের প্রতি। মাঠে তখন আবেগময় মুহূর্ত তৈরি হয়।
ওই সময়টুকু ও কোনের চোট পাওয়ার মুহূর্ত বাদে পুরো ম্যাচেই কাতারের ওপর নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ চালায় কানাডা। যার শেষটা হয় ৭৫ মিনিটে কাতারের মোহাম্মদ মানাইয়ের আত্মঘাতী গোল এবং যোগ করা সময়ে কানাডার জোনাথন ডেভিডের হ্যাটট্রিকসূচক গোলের মাধ্যমে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে স্বাগতিক দেশের হয়ে হ্যাটট্রিক করলেন কানাডা ফরোয়ার্ড। সেটাও দীর্ঘ ৬০ বছর পর—সর্বশেষ ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ড কিংবদন্তি জিওফ হার্স্ট।
প্রথমার্ধে কানাডার তিন গোলের দুটি ডেভিডের, অন্যটি কাইল লারিনের। ১৬ মিনিটে লারিনের গোলের পর বেশ বোঝা যাচ্ছিল, এ ম্যাচে কানাডা বড় ব্যবধানে জিততে যাচ্ছে। প্রথমত, কাতারের রক্ষণকে সব সময় চাপে রেখে গোল আদায় করা। দ্বিতীয়ত, লারিন গোল করলে কানাডা কখনো হারেনি। ২৯ মিনিট ও প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে দুটি গোল করেন ডেভিড।
কাতার ১০ জনের দলে পরিণত হয় ২–০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর। ৩৩ মিনিটে কানাডা ফরোয়ার্ড তেজন বুকানানকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন কাতারের ডিফেন্ডার হোমাম আহমেদ।
বিশ্বকাপে এটা প্রথম জয় কানাডার। বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসাল তারা। এর আগের তিনটি নজির—১৯৩৪ বিশ্বকাপে ইতালি ৭–১ যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৫০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ৭–১ সুইডেন ও ১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ৬–০ পেরু। ১৯৩৪ বিশ্বকাপে ইতালি ও ১৯৫৪ বিশ্বকাপে তুরস্কের পর বিশ্বকাপে ন্যূনতম ছয় গোলের ব্যবধানে প্রথম জয় পেল কানাডা।
বিশ্বকাপে কাতার প্রথম দল, যারা একই ম্যাচে আত্মঘাতী গোল করেছে এবং দুজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখলেন। ‘বি’ গ্রুপে সুইজারল্যান্ডকে পেছনে ফেলে ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে উঠল কানাডা। সুইজারল্যান্ড সমান ম্যাচে পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে দুইয়ে।



