এভারেস্ট শিখরে নুরুননাহার নিম্নির অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প
এভারেস্ট শিখরে নুরুননাহার নিম্নির অবিশ্বাস্য গল্প

এভারেস্ট অভিযানে নুরুননাহার নিম্নি হঠাৎই বাঁ পায়ের ক্র্যাম্পন ছিঁড়ে যাওয়ার মুখে পড়েন। তুষারঝড়ে গগলসের ফাঁক দিয়ে বরফ ঢুকে চোখ জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। হাতে মোটা সামিট গ্লাভস পরা থাকায় গগলস ঠিক করতে পারছিলেন না। প্রায় ৪০০ মিটার সামনেই এভারেস্ট, আর তিনি মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ এক খাড়া ঢালে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অল্প সময় পরই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ হবে, কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—সব শেষ।

ক্যাম্প ২ থেকে ক্যাম্প ৩: নির্বিঘ্ন যাত্রা

২৫ মে সকালে যথাসময়ে ঘুম ভাঙল। ক্যাম্প ৩–এর উদ্দেশে পথ ধরলেন। ব্যাগে তেমন কিছু ছিল না, বেশির ভাগ জিনিস ক্যাম্প ৩-এ রেখে এসেছিলেন। ছিল শুধু কিছু শুকনা খাবার আর অক্সিজেন সিলিন্ডার। তৈরি হয়ে ডাইনিং তাঁবুতে এসে কোনোমতে নাশতা সেরে নিলেন। ভারতের অঞ্জনা যাদব ও ভিনেই, ইথিওপিয়ার ইয়োনাস—সবাইকে বেশ উজ্জীবিত লাগছিল। সবার চোখেমুখে আসন্ন সামিটের আনন্দ। গাইডরা এসে বের হওয়ার জন্য তাড়া দিল।

আজ তার গতি বেশ ভালো ছিল। শরীর ও মন—দুটোই সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। পথে অঞ্জনাকে পেছনে ফেলে চলে এলেন। গাইড মিলান জানাল, এই গতিতে চলতে থাকলে সামিট নিশ্চিত। ক্যাম্প ২ থেকে ক্যাম্প ৩-এর পথের প্রথম অংশ একদম সোজা। তেমন কোনো চড়াই-উতরাই নেই, শুধু হেঁটে যাওয়া। ক্র্যাম্পন পয়েন্ট পর্যন্ত যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগল। এরপর শুধু ওপরে ওঠা। বিশ্রাম নেওয়ার মতো জায়গাও নেই। তাই সেখানেই একটু পানি ও চকলেট খেয়ে নিলেন। আরেক গাইড দাওয়া ক্র্যাম্পন পরে নিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শুরুতেই প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া চড়াই। দড়িতে জুমার লাগিয়ে তিনি প্রস্তুত। আগে একবার এসেছিলেন বলে এগুলো এখন অনেক সহজ মনে হয়। বরফের দেয়ালে লাগানো মই বেয়ে এবং কঠিন বরফে ক্র্যাম্পন ও জুমারের সাহায্যে সহজেই এই অংশ পার হয়ে ওপরে উঠে গেলেন। এখন টানা তিন-চার ঘণ্টা বরফের দেয়ালে জুমার চালিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ৬ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতা থেকে ৭ হাজার ৭০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প ৩-এ পৌঁছাতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একটার পর একটা রোপ পেরিয়ে যাচ্ছিলেন। এবার এভারেস্টে পর্বতারোহীদের বেশ জটলা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই শেষ পর্যায়ে ক্লাইম্বার কম থাকায় কোথাও অপেক্ষা করতে হচ্ছিল না। চার ঘণ্টার মধ্যে তিনি ও তার শেরপা ক্যাম্প ৩-এ পৌঁছে গেলেন।

তুষারপাতের মধ্যে ক্যাম্প ৩-এ রাত

একটি খাড়া ঢালের ওপর ক্যাম্প ৩। ঠিকমতো দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। সরাসরি তাঁবুতে ঢুকে পড়েন। গাইড লাকপা চা ও বিস্কুট নিয়ে এল। এখানে কোনো ডাইনিং তাঁবু নেই। ছোট্ট গ্যাসের চুলায় সামান্য চা, গরম পানি বা স্যুপ তৈরি করা হয়। শুকনা খাবারই ভরসা। বেলা একটার দিকে অঞ্জনা, ইয়োনাস ও ভিনেইও চলে এল। অঞ্জনা আর তিনি একই তাঁবুর বাসিন্দা। দুপুরে তাদের ভেজিটেবল স্যুপ দেওয়া হলো। এরই মধ্যে শুরু হলো প্রচণ্ড তুষারপাত।

আবহাওয়া ভালো থাকবে জেনেই তারা এসেছিলেন। তুষারপাত দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তুষারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল ক্ষুধা। সামান্য ভেজিটেবল স্যুপে কাজ হলো না। তারা চিৎকার করে গাইডদের ডাকতে থাকেন। এই দুর্যোগে কেউ শুনতে পেল না। অনেকক্ষণ পরে লাকপা তাদের ডাক শুনে এল। তারা খাবার চাইলেন। সে দুটি নুডলস স্যুপ বানিয়ে দিতে রাজি হলো।

তারা নিজেদের কাছে থাকা শুকনা খাবার খেতে থাকেন। ক্যাম্প ৩-এ তারা সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ব্যবহার করছিলেন। শুধু খাওয়ার সময় অক্সিজেন মাস্ক খুলে খাবার খান। তাঁবুর পেছনের জানালা দিয়ে অন্য তাঁবুতে থাকা ইয়োনাস–ভিনেইয়ের সঙ্গে কথা বলেন। ওদের বেশ ক্লান্ত দেখায়, কিন্তু তিনি ও অঞ্জনা উত্তেজনায় টগবগ করছিলেন। বারবার একে অপরকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন—আমরা পারব।

কিছুক্ষণ পর গাইড মিলান এসে জানাল, ভোর চারটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নাশতা সেরে ক্যাম্প ৪-এর উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। বিকেল পাঁচটার দিকে রাতের খাবার খেয়ে নিলেন। রাতের খাবার বলতে ক্যাম্প ২ থেকে নিয়ে আসা ফ্রায়েড রাইস। এই খাবার খাওয়া ছিল ভীষণ কষ্টকর। তারপরও জুস আর পানি দিয়ে গিলে নিচ্ছিলেন; কারণ, এই খাবারই ক্যাম্প ৪-এর পথে তাকে শক্তি জোগাবে।

ক্যাম্প ৪: ডেথ জোনের ভয়াবহতা

সকালে বের হতে হতে সাড়ে ছয়টা বেজে গেল। অঞ্জনা ও মিলান আগেই বেরিয়ে গেছে। ভিনেইয়ের বুকে ব্যথা হওয়ায় সে গাইডসহ নিচে নেমে গেছে। তার গাইডের তৈরি হতে একটু সময় লাগল। তাই বের হতে দেরি হলো। ক্যাম্প ৩ থেকে ক্যাম্প ৪ পর্যন্ত পুরো পথই খাড়া চড়াই। ক্যাম্প থেকে বের হয়েই দড়িতে জুমার লাগান। তার ভেতরে তীব্র উত্তেজনা। বাইরে ভয়ংকর তুষারঝড়। তার মধ্যেই তারা এগিয়ে চলেছেন। যত দূর জানা, আজ আবহাওয়া এমনই থাকবে, সন্ধ্যার দিকে উন্নতি হবে।

দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মাঝেমধ্যে রোপে ঝুলেই পানি খাচ্ছিলেন, চকলেট খাচ্ছিলেন। সামনে থাকা অঞ্জনাকে পেরিয়ে তারা এগিয়ে যান। একটার পর একটা বিশাল বরফের দেয়াল অতিক্রম করে আর আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে ক্যাম্প ৪-এ পৌঁছান। আট হাজার মিটার উচ্চতায়, প্রায় সমতল জায়গায়, ডেথ জোনে এই ক্যাম্প ৪। দুই দিন ধরে এখানে আবহাওয়া খারাপ। তীব্র বাতাসে তাঁবুগুলো ছিঁড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ক্যাম্পজুড়ে ঝড়ের তাণ্ডবের চিহ্ন। ছেঁড়া তাঁবু, ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডার, চুলা, খাবার—সবকিছু এলোমেলো পড়ে আছে। সব মিলিয়ে ক্যাম্প ৪ যেন ময়লার বিশাল এক স্তূপ।

তার গাইড কোনোমতে একটি তাঁবু ঠিক করে তাকে বসার ব্যবস্থা করল। তাকে জিজ্ঞেস করেন, ক্যাম্প ৪ পরিষ্কার করা হয় না? উত্তর শুনে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। ক্যাম্প ৪ নাকি প্রায় সব সময়ই এমন ময়লা থাকে, নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ইতিমধ্যে অঞ্জনা ও অন্য শেরপারাও এসে পৌঁছেছে। তাঁবুর ভেতরেও তাদের বাতাসের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে; কারণ, তাঁবুর বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে গেছে।

ফাইনাল সামিট পুশ: বিপত্তি ও বিজয়

কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর তারা ফাইনাল সামিট পুশের প্রস্তুতি নিলেন। সামিট স্যুটের পকেটে বিভিন্ন ধরনের চকলেট ভরে নেন। গরম পানির বোতল বুকের কাছে স্যুটের ভেতরের পকেটে রাখেন। না হলে পানি বরফ হয়ে যাবে। এই গরম পানির বোতল আবার শরীরও গরম রাখবে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তারা ক্যাম্প ৪ থেকে রওনা দেন। তারাই প্রথম দল হিসেবে ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়েছেন। বাতাস থেমে গেছে। আবহাওয়া পরিষ্কার। অদ্ভুত সুন্দর সূর্যাস্ত মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি, অঞ্জনা এবং তাদের সঙ্গে পাঁচজন গাইড এগিয়ে চলেছেন। তাদের এজেন্সি অতিরিক্ত গাইড দিয়েছে, যেন কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সহায়তা নেওয়া যায়।

চলতে চলতে একসময় ব্যালকনিতে পৌঁছান। সেখানে তার গাইড অক্সিজেন সিলিন্ডার বদলে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আরও অনেক ক্লাইম্বার সেখানে চলে আসে। তবে অন্য দিনের মতো কোনো জটলা নেই। ব্যালকনিতে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল বাতাস ও তুষারঝড় শুরু হয়ে যায়। তার গগলস একটু ঢিলা করে বাঁধা ছিল। তুষারের কণা চোখে ঢুকে গেল। এর মধ্যেই ক্র্যাম্পন ছিঁড়ে পড়েন সেই বিপত্তিতে। চিৎকার করে তার গাইড দাওয়াকে ডাকতে থাকেন। সে শুনতে পেল না। পেছন থেকে লাকপা শুনে তাকে জানাল যে তার ক্র্যাম্পন ছিঁড়ে গেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে দাওয়া চলে এল। একটি দড়ি কেটে এনে ক্র্যাম্পন বেঁধে দিল। সাবধানে পাথরের ওপর পা ফেলতে বলল। লাকপাও চলে এসেছে। সে তার স্নো গগলস তাকে দিল। এরপর যেন আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন। আবার এগিয়ে চললেন। একটার পর একটা বরফের দেয়াল পেরিয়ে যাচ্ছিলেন। ঢাকার প্রিয় মুখগুলোর কথা মনে পড়ছে। সবাই উৎকণ্ঠা নিয়ে তার সামিটের অপেক্ষায় আছে। শাকিল ভাই, শম্পা আপু, শাম্মি, তামান্না, তমা, বন্ধু শম্পা—অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

একসময় হিলারি স্টেপে পৌঁছে গেলেন। সেখান থেকে শিখর মোটে ৬০ মিটার। ইতিমধ্যে আবহাওয়া পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছে। পূর্বাকাশ রক্তিম হয়ে আছে। ধীরে ধীরে নতুন দিনের সূর্য উঠল। এমন সুন্দর সূর্যোদয় আগে কখনো দেখেননি। সূর্যোদয় দেখতে দেখতে সামিটের কাছে পৌঁছে যান। কতশত দিনের পরিশ্রম, অপেক্ষা, স্বপ্ন আর সংগ্রামের ফল। তিনি চূড়া ছুঁয়ে দেখেন। তিনি পেরেছেন, তার স্বপ্নকে ছুঁতে পেরেছেন।