বাংলাদেশ ফুটবলে নতুন অধ্যায়: টমাস ডুলির আগমন
বাংলাদেশ ফুটবলে নতুন অধ্যায়: টমাস ডুলির আগমন

বাংলাদেশ ফুটবলের গল্পে বিদেশি কোচ যেন এক অদ্ভুত অধ্যায়। এখানে কেউ এসেছেন দেশের ফুটবলে ত্রাতা হয়ে, কেউ বিদায় নিয়েছেন নীরবে বা গোপনে। কেউ দেশের ফুটবলকে ট্রফি এনে দিয়েছেন, কেউ রেখে গেছেন শুধুই দীর্ঘশ্বাস। প্রায় পাঁচ দশকের সেই ইতিহাসে আজ যুক্ত হলো নতুন একটি নাম—টমাস ডুলি।

সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা সাবেক ফুটবলার টমাস ডুলি। আজ সকালে ঢাকায় পৌঁছেছেন ৬৫ বছর বয়সী এই জার্মান বংশোদ্ভূত কোচ। বাফুফেও অফিশিয়ালি তাঁকে নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার থেকেই জাতীয় দলের ক্যাম্পে দেখা যাবে ডুলিকে।

বিদেশি কোচের ঐতিহ্য

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস জানে, বিদেশি কোচ মানেই শুধু নতুন মুখ নয়, নতুন এক স্বপ্নও। কিন্তু এই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শঙ্কা, সংশয় ও কঠিন বাস্তবতাও। কারণ, এই দেশে বিদেশি কোচরা কখনো ইতিহাস লিখেছেন, আবার কখনো বাস্তবতার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে দ্রুত হারিয়েও গেছেন। হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন নিজের ভুবনে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশ জাতীয় দলে বিদেশি কোচের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ওয়ার্নার বেকেল হপ্ট ছিলেন প্রথম বিদেশি কোচ। তখনো বাংলাদেশের ফুটবল নিজেদের পরিচয় খুঁজছিল। স্বাধীনতার পর শেখ সাহেব আলীর ‘ঢাকা একাদশ’ ছিল কার্যত জাতীয় দল। পরে বাফুফে এএফসির সদস্য হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। ১৯৭৩ সালে খেলে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কিন্তু সেই সময় বিদেশি কোচ ছিল অনেকটা পরীক্ষামূলক ব্যাপার, কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে তাই দেওয়া। ব্যাপারটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ ছিল না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সফল বিদেশি কোচ

সময়ের সঙ্গে কিছু বিদেশি কোচ বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম সম্ভবত অটো ফিস্টার। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে জার্মান এই কোচ কিংবদন্তি মোনেম মুন্নাকে অধিনায়ক করে শুধু একটি দল গড়েননি, বদলে দিয়েছিলেন ফুটবলারদের মানসিকতাও। তাঁর অধীনেই বাংলাদেশ মিয়ানমারে জেতে চার জাতির টাইগার ট্রফি, যেটি ছিল দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল শিরোপা। সেই সময়ের ফুটবলার মামুন জোয়ার্দার, ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব, আরমান, মাসুদ রানারা এখনো বলেন, ফিস্টার প্রথম তাঁদের শিখিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে পেশাদার মানসিকতা কী বা কেমন হওয়া উচিত।

এরপর এলেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপে খেলা ইরাকের সামির শাকের। এই কোচের হাত ধরেই বাংলাদেশ ১৯৯৯ দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে জেতে ঐতিহাসিক সোনা। সেই দলটির লড়াই, শৃঙ্খলা আর আত্মবিশ্বাস এখনো বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম সেরা স্মৃতি। কিন্তু সামির শাকেরের বিদায়টা ভালো হয়নি। বাংলাদেশ সোনা জেতার পর তিনি একাকী, গোপনে কাঠমান্ডুর ভ্রিভুবন বিমানবন্দর ছেড়ে যান। ঘটনাচক্রে এই প্রতিবেদক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ‘এভাবে চলে যাচ্ছেন কেন’—প্রশ্ন করলে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে কর্মকর্তাদের নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন সামির।

তবে বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বিদেশি কোচদের সবচেয়ে বড় সাফল্যের প্রতীক সম্ভবত জর্জ কোটান। অস্ট্রিয়ান এই কোচের অধীনেই বাংলাদেশ ২০০৩ সালে জেতে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে সুজনের শেষ শটে মালদ্বীপকে হারানোর সেই রাতে ট্রফি উঁচু করার দৃশ্য এখনো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে জীবন্ত। কোটান শুধু একটি ট্রফি দেননি, পুরো দেশকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন—বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা হতে পারে। তিনি খেলোয়াড়দের অনেক যত্ন নিতেন। আজকের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হককে চোট থেকে সারিয়ে তুলে সাফে খেলিয়েছিলেন তো কোটানই।

অনিশ্চিত অধ্যায়

কিন্তু পরের গল্পটা আর ততটা উজ্জ্বল নয়। বাংলাদেশের ফুটবলে বিদেশি কোচরা এসেছেন, আবার চলে গেছেন দ্রুতই। কেউ তিন মাস, কেউ ছয় মাস। কেউ খেলোয়াড়দের মান নিয়ে হতাশ হয়েছেন, কেউ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় বিরক্ত। ইতালির ফাবিও লোপেজ, বেলজিয়ামের টম সেইন্টফিট, স্পেনের গনজালো মোরেনো, অ্যানড্রু অর্ড কিংবা সার্বিয়ার জোরান জর্জেভিচ—অনেক নামই যেন সময়ের ভিড়ে হারিয়ে গেছে।

জোরানের অধীনে বাংলাদেশ ২০১০ এসএ গেমসে ফুটবলে সোনা জিতেছিল, তবে জাতীয় দলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির ছবি তখনো দেখা যায়নি। জোরান সাফল্য এনে দিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাফুফের তৎকালীন কর্তারা তাঁকে রাখেননি।

জেমি ডে অবশ্য দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ছিলেন। ইংল্যান্ডের এই কোচের সময়ে দল কিছুটা সংগঠিতও হয়েছিল। ২০১৮ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দল নিজেদের ইতিহাসের সেরা পারফরম্যান্স করে। শক্তিশালী কাতারকে ১-০ গোলে হারিয়ে এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোয় উঠেছিল। এই সাফল্য দেশের ফুটবলের হারানো জনপ্রিয়তা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় কোনো সাফল্য আসেনি।

সবশেষে হাভিয়ের কাবরেরার সময়টাও ছিল একধরনের বৈপরীত্যে ভরা। প্রায় ৫২ মাস দায়িত্বে ছিলেন স্প্যানিশ এই কোচ—বাংলাদেশের ফুটবলে কোনো কোচের এত দীর্ঘ সময় থাকাটা বিরলই। তাঁর সময়ে বাংলাদেশ দলে যোগ দেন হামজা চৌধুরীর মতো ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা ফুটবলার। কাগজে-কলমে এটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর একটি। কিন্তু মাঠে সেই শক্তির প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যায়নি। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল ছাড়া বড় কোনো অর্জন নেই তাঁর সময়ে।

টমাস ডুলির চ্যালেঞ্জ

এমন বাস্তবতায় নতুন কোচ টমাস ডুলির সামনে চ্যালেঞ্জ বিশাল। ডুলির পরিচিতি অবশ্য আন্তর্জাতিক মানের। খেলোয়াড়ি জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ৮১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। ক্লাব ফুটবলে খেলেছেন বায়ার লেভারকুসেন, শালকে ও কাইজারস্লাউটার্নের মতো বড় ক্লাবে। শালকের হয়ে জিতেছেন উয়েফা কাপ, কাইজারস্লাউটার্নের হয়ে জিতেছেন বুন্দেসলিগা।

কোচ হিসেবেও তাঁর অভিজ্ঞতা কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের সহকারী ছিলেন। ফিলিপাইন জাতীয় দলকে কোচিং করিয়েছেন। ভিয়েতনামের ক্লাব ফুটবলেও কাজ করেছেন স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে। সর্বশেষ ছিলেন গায়ানা জাতীয় দলের দায়িত্বে। ফিলিপাইনের কোচ হিসেবে দলটিকে প্রথমবার তুলেছেন এশিয়ান কাপে।

কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবল শুধু বড় সিভি দিয়ে বদলায় না। এখানে সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, দুর্বল ঘরোয়া লিগ, বয়সভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব, ফুটবল প্রশাসনের অস্থিরতার কথা নতুন করে না বললেও চলে। সব মিলিয়ে দেশের ফুটবল এক জটিল বাস্তবতার মধ্যে আটকে আছে। বিদেশি কোচদের প্রায় সবাই এসে প্রথমে প্রতিভার কথা বলেন, পরে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে হেরে ফিরে যান।

তাই টমাস ডুলির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কৌশল নয়, এখানকার ভিন্ন সংস্কৃতিতে মানিয়ে নেওয়া। তিনি কি বাংলাদেশের ফুটবল–বাস্তবতা বুঝতে পারবেন? শুধু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়ে চলে যাবেন, নাকি সত্যিই দলটিকে বদলে দিতে পারবেন? আর বদলে দেবেনই–বা কাদের নিয়ে? যে দেশে একজন আন্তর্জাতিক মানের স্ট্রাইকার নেই, যে দেশ বেশির ভাগ ম্যাচই খেলে প্রথাগত স্ট্রাইকার ছাড়া, সেই দেশের ফুটবলকে কীভাবে বদলে দেবেন ডুলি?

ইতিহাস অবশ্য বলে, একজন কোচ কখনো কখনো পুরো ফুটবল–সংস্কৃতিতেই পরিবর্তনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে পারেন। যেমনটা করেছিলেন অটো ফিস্টার, জর্জ কোটান। টমাস ডুলি কি পারবেন সেই পথ ধরতে? উত্তরটা এখন কারও জানা নেই। তবে ডুলি আজ সকালে ঢাকায় নামার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে আবারও শুরু হলো নতুন এক বিদেশি স্বপ্নের অধ্যায়।