বাঘ নাকি শিকারের আগে এক পা পেছনে যায়। সেনেগালের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচের প্রথমার্ধটা ফ্রান্সের জন্য ছিল তেমনই। খেলা দেখে মনেই হচ্ছিল না এই দলে কিলিয়ান এমবাপ্প, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে এবং দেজিরে দুয়ের মতো বিশ্বসেরা তারকারা খেলেন! কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সেই ফ্রান্স আমূল বদলে গেল। আর এই রূপ বদলের নায়ক এমবাপ্পে। তাঁর রেকর্ড গড়া জোড়া গোলে নিউ জার্সিতে গ্রুপ ‘আই’য়ের ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্স জিতেছে ৩–১ ব্যবধানে।
ম্যাচের বিবরণ
ফ্রান্সের অন্য গোলটি ব্র্যাডলি বারকোলার। আর সেনেগালের হয়ে একমাত্র গোলটি করেছেন ইব্রাহিম এমবায়ে। বিশ্বকাপ আসলে এমবাপ্পের শরীরে অশরীরী কিছু একটা ভর করে। এক আশ্চর্য জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সেই শক্তিই যেন বিরতির পর ফিরে পান ফরাসি তারকা। আর এমবাপ্পে যখন শিকারি রূপে ফিরলে প্রতিপক্ষের আফসোস ছাড়া কিছু করার থাকে না। প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ পেয়েও গোল করতে না পারা সেনেগালকে সেই আফসোসটাই করতে হলো।
এমবাপ্পের রেকর্ড
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে যেখানে শেষ করেছিলেন, বিরতির পর এমবাপ্পের শুরুটা হলো যেন সেখান থেকেই! ৬৬ মিনিটে করেন এবার বিশ্বকাপে নিজের ও দলের প্রথম গোল, যে গোলে তিনি ফ্রান্সের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে ছুঁয়ে ফেলেন অলিভিয়ের জিরুকে। দুজনের গোল তখন ৫৭। এই গোলে মাইকেল ওলিসের অবদানও ছিল দুর্দান্ত। ডান পাশে বক্সের বাইরে থেকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ডিফেন্ডারদের ভেতর দিয়ে যেভাবে বলটি বের করেছেন, তা বুঝিয়ে দিয়েছে কেন তাঁকে এই মুহূর্তে বিশ্বসেরা মিডফিল্ডারদের একজন বিবেচনা করা হয়। ওলিসের পাসে এমবাপ্পের ফিনিশিংটা ছিল যেন মাখনের ভেতরে ছুরি চালানোর মতো। গোলটির আগে সেনেগালের পোস্টে দুর্দান্ত কিপিং করা এদুয়ার্দো মেন্দির আসলে অমন ফিনিশিংয়ের বিপরীতে কিছু করার ছিল না।
৮২ মিনিটে ফ্রান্সের হয়ে ব্যবধান ২–০ করেন বারকোলা। মাঠে নামার মাত্র ৩ মিনিটের মধ্যে গোলটি করেন। যোগ করা সময়ের ৫ মিনিটের মাথায় সেনেগালের হয়ে এক গোল শোধ করেন এমবায়ে। তবে এই গোলের রেশ কাটার আগে আবার এমবাপ্পের জাদু। বক্সের বাইরে থেকে করা এমবাপ্পের এই গোলটাও ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখার মতো। এমন গোলে মনে পড়ে যায় জীবনানন্দ দাশের সেই অমর লাইন, ‘তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়।’ আসলে এমবাপ্পের অমন দারুণ গোলের দৃশ্যের কাছেও তো বারবার ফিরে যাওয়া যায়! দুর্দান্ত এই গোলেই এমবাপ্পে ছাড়িয়ে গেলেন জিরুকে। ৯৯ ম্যাচে ৫৮ গোলে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড।
পাশাপাশি বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল এখন ১৪। অর্থাৎ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছুঁতে এমবাপ্পের প্রয়োজন মাত্র ২ গোল। চূড়ায় উঠতে প্রয়োজন ৩ গোল। শুরুটা যেভাবে করলেন এমবাপ্পে, তাতে ক্লোসার রেকর্ড ভাঙাটা সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে। রেকর্ড গড়া গোলের পরপর এমবাপ্পে শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছেন জিরুর কাছ থেকে। ফ্রান্স-সেনেগাল ম্যাচে বিবিসি ওয়ানের বিশ্লেষক হিসেবে থাকা জিরু বলেন, ‘অভিনন্দন কিলিয়ান। আমি খুশি। এটা স্বাভাবিকই, প্রত্যাশিতও ছিল। সে সব রেকর্ড ভেঙে দেবে—জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ খেলার সংখ্যা ও গোলের রেকর্ড দুটিই। আমার মনে হয়, সে সহজেই ১০০ গোল করতে পারে। এমনকি বিশ্বকাপে মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ডও ভেঙে দিতে পারে। বিশ্বকাপ ও বড় ম্যাচগুলোতে সে দারুণ পারফরম্যান্স করেছে।’
মনে রাখতে হবে এমবাপ্পে যখন এসব রেকর্ড ভাঙা গড়ার খেলা খেলছেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর। ক্যারিয়ার শেষে এমবাপ্পে যে চূড়ায় উঠেই থামুন না কেন, সেটা মাপজোখে যে বিস্ময়কর কিছু হবে, তা বলাই যায়। বিশ্বকাপে আপাতত ফ্রান্সের সামনে এখন ইরাক। ২২ জুন দলটির মুখোমুখি হবে ফ্রান্স। কে জানে, সে ম্যাচেই হয়তো বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারেন!



