লেস্টার সিটির অবনমন: প্রিমিয়ার লিগ জয়ের ক্লাবের তৃতীয় বিভাগে পতন
সময়টা মোটেই ভালো যাচ্ছে না লেস্টার সিটির। অবনমন এড়ানোর আশা টিকিয়ে রাখতে জিততেই হতো তাদের। ৬২ মিনিট পর্যন্ত ২-১ গোলে এগিয়ে থেকে সেই লক্ষ্যপূরণের কাছাকাছিই ছিলেন হামজা চৌধুরীরা। কিন্তু ৬৩ মিনিটে হাল সিটির সমতাসূচক গোলে শেষ পর্যন্ত ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় স্তরে টিকে থাকতে পারেনি লেস্টার। গতকাল রাতে হাল সিটির বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করায় তৃতীয় বিভাগ অর্থাৎ লিগ ওয়ানে অবনমন নিশ্চিত হয় লেস্টারের।
১০ বছরের উত্থান-পতনের গল্প
১০ বছর আগেও মৌসুমের এই পর্যায়ে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জয়ের প্রহর গুনছিল লেস্টার। কিন্তু আগামী মৌসুমে খেলতে হবে তৃতীয় বিভাগে—যেটা লেস্টারের ১৪২ বছরের ক্লাব ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো। এতে একটি চক্রপূরণও হলো লেস্টারের, যদিও সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত। ২০১৬ সালে ৫০০০-১ বাজিতে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের অবিশ্বাস্য রূপকথার জন্ম দেওয়ার ৭ বছর আগে লিগ ওয়ান থেকে ফিরেছিল ক্লাবটি। আর এবার সেই লেস্টারই টানা দ্বিতীয় দফা অবনমনের শিকার হলো। ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ থেকে চ্যাম্পিয়নশিপে (দ্বিতীয় বিভাগ) নেমে যাওয়ার পর এবার আরও এক ধাপ অবনমন হলো লেস্টারের।
হাল সিটির বিপক্ষে ড্রয়ের পর লেস্টারের উইঙ্গার ফাতায়ু ইশাহাকুর হতাশা প্রকাশ করেছেন। গত এক দশকে আসলে আনন্দ-বেদনার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে লেস্টারকে। প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি জয়ের দুই বছর পর হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মালিক ভিচাই শ্রীবদ্ধনপ্রভাকে হারানো, ২০২১ সালে এফএ কাপ জয় এবং তারপর নামতে নামতে এই তলানিতে এসে ঠেকল লেস্টার।
কীভাবে ঘটল এই পতন?
২০২২ সালে প্রিমিয়ার লিগে অষ্টম হওয়া এবং কনফারেন্স লিগের সেমিফাইনালে ওঠার পর লেস্টারের তৎকালীন কোচ ব্রেন্ডন রজার্স সতর্ক করেছিলেন, ক্লাবকে এখন তাদের প্রত্যাশার পারদ কমাতে হবে। ক্লাবটির মালিকানাধীন ডিউটি-ফ্রি রিটেইলার প্রতিষ্ঠান ‘কিং পাওয়ার’-এর ব্যবসায় কোভিডের বড় প্রভাব পড়েছিল সেই সময়। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ২০২২-২৩ মৌসুমের শুরুতে টানা আট ম্যাচ জয়হীন থাকার পর রজার্স বলেছিলেন, লেস্টারের এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত ৪০ পয়েন্ট অর্জন করা। লেস্টার সেই লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছেও গিয়েছিল।
এর আগে ২০২০ ও ২০২১ সালে টানা দুই মৌসুমে শেষ দিনে অল্পের জন্য চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি তারা। রজার্সের অধীনেই টমাস টুখেলের চেলসিকে হারিয়ে তারা এফএ কাপ জিতেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে দ্রুতই ক্লাবটির পতন শুরু হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে রজার্সকে বরখাস্ত করা হয়। ক্লাবটি তখন প্রিমিয়ার লিগের অবনমন অঞ্চলে (শেষ তিনে)। অ্যাস্টন ভিলা ও নরউইচের সাবেক কোচ ডিন স্মিথকে দায়িত্ব দিয়েও সেবার রক্ষা হয়নি।
কোচ পরিবর্তন ও আর্থিক সংকট
রজার্স বিদায় নেওয়ার পর গত তিন বছরে লেস্টার সাতজন কোচ বদলেছে। নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা বা ধরন ছাড়া বারবার কোচের পরিবর্তন নিয়ে ক্লাবের নীতিনির্ধারণী মহলেও প্রশ্ন ওঠে। স্মিথের পর এনজো মারেস্কা কোচের দায়িত্ব নিয়ে ২০২৪ সালে ক্লাবকে চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জেতান এবং প্রিমিয়ার লিগে ফেরান। কিন্তু ফিরেও প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকতে পারেনি লেস্টার। ২০২৪–২৫ মৌসুমে আবারও অবনমন হয় তাদের। এর মধ্যে ক্লাবের ভাগ্য ফেরানোর লক্ষ্যে গ্রাহাম পটারকে পাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলে নিয়োগ দেওয়া হয় স্টিভ কুপারকে। এরপর আসেন রুদ ফন নিস্টেলরয়, যার অধীনে ২৭ ম্যাচের মাত্র ৫টিতে জিতেছিল দল। তাঁকেও ছাঁটাই করা হয়। এরপর আসেন মার্তি সিফুয়েন্তেস। তাঁকেও সরিয়ে শেষ পর্যন্ত সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি রোয়েটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাকে কি না গত ডিসেম্বরেই অবনমন অঞ্চলের আরেক দল অক্সফোর্ড বরখাস্ত করেছিল।
রোয়েটের অধীনে লেস্টারের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে আর্থিক নিয়ম ভাঙায় ইএফএল তাদের ৬ পয়েন্ট কেটে নেয়। ফলে কোনোমতে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে অবনমন অঞ্চলের বাইরে ছিল তারা। ক্লাব সংশ্লিষ্ট সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষের মধ্যে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ এমন মানসিকতা কাজ করেছে। ২০২৩ সালে প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমনের সময়ও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। গত শনিবার পোর্টসমাউথের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে টিম বাসে ওঠার সময় সমর্থকদের সঙ্গে তর্কে জড়ান লেস্টার মিডফিল্ডার হ্যারি উইঙ্কস। ইংল্যান্ডের হয়ে ১০ ম্যাচ খেলা এই ফুটবলার গতকাল রাতে হাল সিটির বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নামার সময় তাঁর দলের সমর্থকেরাই তাঁকে দুয়ো দেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীও এ ম্যাচে বদলি হয়ে মাঠে নামেন।
আর্থিক ক্ষতি ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
অবনমন লেস্টারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ২০২৩-২৪ মৌসুম পর্যন্ত নির্ধারিত সীমার চেয়ে ২ কোটি ৮ লাখ পাউন্ড বেশি লোকসান করায় আগেই তাদের ৬ পয়েন্ট কাটা হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসে জানানো হয়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে লেস্টারের লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ১১ লাখ পাউন্ডে। ২০২৩-২৪ পর্যন্ত টানা দুই মৌসুম লেস্টারের আয়ের চেয়েও খেলোয়াড়দের বেতন দেওয়ার হার ছিল ১০০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, ক্লাবটি যা আয় করত, তার চেয়েও বেশি খরচ হতো শুধু বেতনেই।
প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমনের মৌসুমে টেলিভিশন স্বত্ব থেকে আয় আসায় এই হার ৮২ শতাংশে নেমেছিল, তবে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের পেছনে তখনো মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হতো তাদের। চুক্তি অনুযায়ী অবনমনের কারণে খেলোয়াড়দের বেতন কিছুটা কমলেও চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়নশিপে সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া ফুটবলারদের তালিকায় ছিলেন লেস্টারের বেশ কয়েকজন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অস্ট্রেলীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ‘ম্যাককুয়ারি’ থেকে নেওয়া ঋণের বোঝা। গত জানুয়ারিতে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রাপ্য সব ‘প্যারাশুট পেমেন্ট’ও (অবনমন হওয়া ক্লাবের জন্য বিশেষ বরাদ্দ) ঋণের বিপরীতে অগ্রিম তুলে নিয়েছে তারা।
ক্লাব মালিক ‘টপ’ এর আগে কয়েক শ মিলিয়ন পাউন্ডের ঋণ মওকুফ করেছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যতের আয়ের বিপরীতে ম্যাককুয়ারি থেকে প্রচুর অগ্রিম অর্থ নিয়ে ফেলেছে ক্লাবটি। লিগ ওয়ানে (তৃতীয় স্তর) টেলিভিশন স্বত্ব থেকে আয় অনেক কমবে, ফলে ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি দেওয়ার মতো পুঁজিও একসময় ফুরিয়ে আসবে লেস্টারের। আগামী মৌসুম থেকে লিগ ওয়ানের ক্লাবগুলো তাদের আয়ের মাত্র ৬০ শতাংশ ফুটবলারদের পেছনে খরচ করতে পারবে। কিন্তু লিগ ওয়ানের মানদণ্ডে লেস্টারের অনেক ফুটবলারের বেতন আকাশচুম্বী। ফলে এই নতুন নিয়মের অধীনে ক্লাব পরিচালনা করা লেস্টারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।



